রাজধানীর উত্তরা যেন এখন এক নিঃশব্দ কান্নার শহর। হাই কেয়ার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকের ‘অবহেলায়’ প্রাণ গেল ৫৪ বছর বয়সী জালাল উদ্দিন সরকারের। একটি সাধারণ সার্জারি থেকে শুরু হয়ে মাত্র আট দিনের মধ্যে এক পরিবারের কান্নায় পরিণত হলো এক মানুষের জীবন।
ঘটনাটি শুরু হয় গত ২৪ জুন। কোমরের হাড়ে সমস্যার কারণে উত্তরার হাই কেয়ার জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন জালাল উদ্দিন। নিউরো সার্জন বিশেষজ্ঞ ডা. হুজায়ফা আহম্মেদের তত্ত্বাবধানে হয় অপারেশন। তবে সেটাই যেন কাল হয়ে দাঁড়ায়।
অপারেশনের পর দুই দিন পেরোতেই শুরু হয় ঘুমের সমস্যা। বিষয়টি জানানো হয় চিকিৎসককে। তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসককে নির্দেশ দেন ঘুমের ইনজেকশন দিতে। কিন্তু সেই ইনজেকশন দেওয়ার পর আর ঘুম ভাঙেনি জালাল উদ্দিনের। পরের তিন-চার দিন ধরে পরিবারের আকুতি-ফরিয়াদে সাড়া মেলেনি হাসপাতাল থেকে। স্বজনরা উদ্বিগ্ন হয়ে একের পর এক জানালেন, রোগীর অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না—ঘুম ভাঙছে না। কিন্তু প্রতিবারই মিলেছে হাসপাতালের একটাই উত্তর: “চিন্তার কিছু নেই।”
শেষ পর্যন্ত ৩০ জুন রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। তখন তাকে নেয়া হয় আইসিইউতে। কিন্তু ততক্ষণে শরীরে দেখা দেয় বিপজ্জনক লক্ষণ—শরীর নীল হয়ে যায়, ঠাণ্ডা হয়ে আসে। পরিবারের সদস্যরা বারবার জানান বিষয়টি। তখনো হাসপাতালের একই জবাব, “সব ঠিক আছে।”
এরপর আসে সেই বিভীষিকাময় সন্ধ্যা—২ জুলাই। হাসপাতাল জানায়, জালাল উদ্দিন আর নেই।
জালাল উদ্দিনের ভাতিজা এর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন উত্তরা পশ্চিম থানায়। অভিযুক্ত করা হয়েছে অপারেশনের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. হুজায়ফা আহম্মেদকে। মামলায় অভিযোগ তোলা হয়েছে, রোগীকে সঠিক চিকিৎসা না দিয়ে, শুধু আর্থিক লাভের আশায় হাসপাতালে আটকে রাখা হয়। চিকিৎসকের গাফিলতি ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণেই একজন সুস্থ মানুষকে হারাতে হয়েছে।
উত্তরা পশ্চিম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আবদুর রহিম মোল্লা জানিয়েছেন, “মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। মরদেহের সুরতহাল শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আইনগত তদন্ত প্রক্রিয়া চলবে।”
এখন প্রশ্ন একটাই—একজন সাধারণ নাগরিক চিকিৎসার জন্য যখন হাসপাতালের দ্বারে যায়, তখন কি তার এমন পরিণতি হওয়ার কথা? একটি ইনজেকশন, কয়েক দিনের অবহেলা, আর দায়িত্বহীন প্রতিক্রিয়া কীভাবে কেড়ে নেয় একটি জীবন?
জালাল উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন তুলেছে এই ঘটনা। নিরীহ রোগীদের জীবন নিয়ে এমন খামখেয়ালি যেন আর না ঘটে—এটাই এখন সবার চাওয়া।

