চট্টগ্রাম নগরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার মনোরেল প্রকল্প ঘিরে উঠেছে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ। বিশ্বখ্যাত দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে একটি চক্র প্রকল্পটি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কোনো ধরনের পূর্ণাঙ্গ যাচাই ছাড়াই এই প্রকল্প নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কার্যক্রম এগিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের নাম ‘চট্টগ্রাম মনোরেল ম্যাস ট্রানজিট ইনিশিয়েটিভ’। ২০২৫ সালের ২৪ জুন এতে সমঝোতা স্মারক সই হয়। সিটি করপোরেশনের পক্ষে স্বাক্ষর করেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। অপরদিকে ‘দি আরব কন্ট্রাক্টরস–ওরাসকম–পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’ পক্ষ থেকে স্বাক্ষর করেন কাউছার আলম চৌধুরী।
চক্রটি নিজেকে মিসরের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দি আরব কন্ট্রাক্টরস এবং বৈশ্বিক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ওরাসকম কনস্ট্রাকশনের একমাত্র অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেয়। তবে পরবর্তীতে অভিযোগ ওঠে, এই পরিচয়ের কোনো বৈধ ভিত্তি নেই।
প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। ৭১ দশমিক ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ চারটি রুটে ৭০টি স্টেশনসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা দেখানো হয়, যা বিল্ড, অপারেট, ট্রান্সফার এবং সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্ব পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। পরদিন ২৫ জুন মেয়র বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানের কাছে প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দেন। এতে বলা হয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক বিনিয়োগভিত্তিক প্রকল্প।
এরপর বিডার পরিচালক ড. মো. হুমায়ুন কবির খান তিনটি মন্ত্রণালয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠান। তিনি উল্লেখ করেন, বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে নগর পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়নই লক্ষ্য। পরে স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে সিটি করপোরেশনকে নির্দেশনা দেয়। তবে অন্যান্য মন্ত্রণালয় থেকে সাড়া না মেলায় বিষয়টি অনিশ্চয়তায় পড়ে।
এরপরও ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও জুন মাসে একাধিক সমন্বয় ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় বিভিন্ন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন এবং কথিত কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধি হিসেবে কাউছার আলম চৌধুরী অংশ নেন। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা নিয়ে। মিসরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওরাসকম কনস্ট্রাকশন স্পষ্টভাবে জানায়, বাংলাদেশে তাদের কোনো প্রতিনিধি নেই এবং কাউছার আলম চৌধুরী নামের কোনো ব্যক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, তথাকথিত এই কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং তাদের নাম ব্যবহার সম্পূর্ণ অননুমোদিত।
এদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণা ঠেকাতে কঠোর যাচাই–বাছাই প্রয়োজন। অন্যথায় এমন ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারও বলেন, যেকোনো চুক্তির আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষের পরিচয় ও বৈধতা যাচাই করা দায়িত্বশীলতার অংশ।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, আরজেএসসি এবং বিডার অনুমোদন ছাড়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় কার্যক্রম পরিচালনার কোনো বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। তবুও প্রকল্প সংক্রান্ত প্রক্রিয়া এগিয়েছে। বিডার এক পরিচালক অবশ্য বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, এটি অনেক আগের ঘটনা, তিনি বিস্তারিত মনে করতে পারছেন না।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, বিডার সুপারিশের ভিত্তিতেই তারা প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন এবং প্রাথমিকভাবে সবকিছু বৈদেশিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে নথিপত্র সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে কোনো বৈধ অনুমোদন বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কপি উপস্থাপন করতে পারেনি সিটি করপোরেশন।
অন্যদিকে কাউছার আলম চৌধুরী দাবি করেন, প্রকল্পে মূল বিনিয়োগকারী হিসেবে দি আরব কন্ট্রাক্টরস কাজ করছে এবং ওরাসকম কনস্ট্রাকশন বাস্তবায়নকারী অংশীদার হিসেবে যুক্ত থাকবে। তবে এসব দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন দেখাতে পারেননি। আরও জানা যায়, ২০২২ সালে প্রতারণা মামলায় দণ্ডিত ও সেনাবাহিনীতে অবাঞ্ছিত ঘোষিত এক ব্যক্তির নামও এই কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন। এছাড়া খুলনা ও মোংলা বন্দরের প্রকল্প নিয়েও একই চক্রের নামে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত মনোরেল প্রকল্পটি এখন জালিয়াতি, যাচাইহীন অনুমোদন এবং ভুয়া আন্তর্জাতিক পরিচয়ের অভিযোগে গভীর প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

