এম এস রহমান, পাবনা প্রতিবেদক—
পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার অষ্টমনিষা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ সাতজন শিক্ষকের নিয়োগে জালিয়াতি ও চরম অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে অভিযুক্ত সাত শিক্ষকের কাছ থেকে তাদের গৃহীত বেতন–ভাতা বাবদ ১ কোটি ১৭ লাখ ৫ হাজার ৯১৭ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে বলে নিরীক্ষা কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫৭ সালের ১ জানুয়ারি পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার অষ্টমনিষা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২০ সালের ১২ মার্চ বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক রাকিবুল হাসান। এরপর ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট তিনি নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ সাতজন শিক্ষকের নিয়োগে নানা অনিয়মের বিষয় তুলে ধরা হয়। সম্প্রতি প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অষ্টমনিষা উচ্চ বিদ্যালয়ে মোট ১৪ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। এর মধ্যে ১৩ জন এমপিওভুক্ত। ওই ১৩ জনের মধ্যে সাতজন শিক্ষকের নিয়োগ বিধিসম্মত হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। নিয়োগ সংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আনছার আলী ২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অষ্টমনিষা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে তিনি একই উপজেলার রূপসী উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৯৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ২০০০ সালের জানুয়ারি মাসে এমপিওভুক্ত তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে নিয়োগের সময় প্রধান শিক্ষক পদে প্রয়োজনীয় ১২ বছরের অভিজ্ঞতা তার ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. আয়নুল হক ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি যোগদান করেন। তার নিয়োগ রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনি এ প্রতিষ্ঠানে যোগদানের আগে পাবনার চাটমোহর উপজেলার চিনাভাতকুর ওয়ারেছিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ২০০৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) পদে কর্মরত ছিলেন। তবে যোগদানের সময় তিনি পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র দাখিল করেননি।
একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক (হিন্দু ধর্ম) স্বপ্না রানী পাল ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি যোগদান করেন। তার নিয়োগকালে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সহকারী শিক্ষক রোখসানা খাতুনও একই তারিখে যোগদান করেন। তার ক্ষেত্রেও কৃষি ডিপ্লোমা সনদ না থাকায় নিয়োগ আবেদন বাতিলযোগ্য ছিল বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সহকারী শিক্ষক মো. রেজাউল করিম ২০১০ সালের ১০ জুন যোগদান করেন। ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারির নীতিমালা অনুযায়ী সহকারী শিক্ষক (সমাজবিজ্ঞান) পদে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকায় তার আবেদনও বাতিলযোগ্য ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী তিনি ২০১২ সালে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি অর্জন না করায় উচ্চতর স্কেলের দাবিও গ্রহণযোগ্য নয় বলে প্রতিবেদনে প্রতীয়মান হয়।
একইভাবে সহকারী শিক্ষক (শরীরচর্চা) মুহাম্মদ আলীর সনদ গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানের নয় বলে জানানো হয়েছে। তার নিয়োগ বিধিসম্মত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সহকারী শিক্ষক (ইসলাম ধর্ম) মো. হামিদুর রহমান পরিদর্শনকালে তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সব সনদ প্রদর্শন করতে পারেননি বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এসব অনিয়মের ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কাছ থেকে বেতন–ভাতা বাবদ গৃহীত ১ কোটি ১৭ লাখ ৫ হাজার ৯১৭ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (হিন্দু ধর্ম) স্বপ্না রানী পাল বলেন, “আমার কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল, সে কাগজ জমা দিয়েছিলাম। কোনো কারণে তা অফিসের ফাইল থেকে হারিয়ে গেছে। পরে নতুন করে শিক্ষাগত সনদ দাখিল করেছি। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।”
সহকারী প্রধান শিক্ষক আয়নুল হক বলেন, “মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে আমরা সব শিক্ষক লিখিত জবাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছি। আমার ছাড়পত্র না দেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। পরে তারিখ সংশোধন করে ছাড়পত্র জমা দিয়েছি। এখন মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই মেনে নেব।”
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক মো. রেজাউল করিম বলেন, “আমাদের সাবেক প্রধান শিক্ষক জেলা শিক্ষা অফিস ও ডিজি অফিসে কথা বলে নিয়োগ দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাবে। আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সমাজবিজ্ঞান/বিএসসি হিসেবে সার্কুলার দিয়ে আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং আমি এমপিওভুক্ত হয়েছি।”
প্রধান শিক্ষক মো. আনছার আলী বলেন, “আমার নিয়োগ ও অভিজ্ঞতা সঠিক। সরকারি বিধি অনুযায়ীই আমার নিয়োগ ও বেতন হয়েছে। নিরীক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদন সঠিক নয় বলে আমি মনে করি। তবে তৎকালীন নিয়োগ বোর্ডে যারা ছিলেন, তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।”
এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়া উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতিকুজ্জামান বলেন, “ওই বিদ্যালয়ের সাত শিক্ষকের নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে আমি এখনো কোনো চিঠি পাইনি। চিঠি পেলে নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

