নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অভিযান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত এক বছরে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগে দুদক মোট ৩৯৯টি মামলা করেছে। এসব মামলায় অভিযুক্তের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। তালিকায় আছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবারের সদস্য, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং উচ্চপদস্থ আমলারা।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে তারা ৭৬৮টি অনুসন্ধান শুরু করে এবং এর মধ্যে অধিকাংশের ভিত্তিতেই মামলা দায়ের হয়। অনুসন্ধান ও তদন্তের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই ৩২১টি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে। এ ছাড়া ব্যাংক লোন জালিয়াতি, শেয়ারবাজারে প্রতারণা, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি ও অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
দুদকের অভিযান রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বিশেষ করে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়েরের মধ্য দিয়ে। পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্পে অনিয়ম করে প্লট বরাদ্দের অভিযোগে শেখ হাসিনা, তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, বোন শেখ রেহানা এবং তাঁর সন্তানদের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা করা হয়। শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে সনদ জালিয়াতির অভিযোগে মামলা হয়েছে। সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে কোটি টাকার আত্মসাত এবং বিদেশে কর ফাঁকির অভিযোগেও মামলা হয়েছে।
এছাড়া টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে আবাসন প্রতিষ্ঠান থেকে ‘ঘুষ’ হিসেবে ফ্ল্যাট গ্রহণের অভিযোগে একটি মামলা এবং সজীব ওয়াজেদের বিরুদ্ধে কেম্যান আইল্যান্ডে ৩০ কোটি ডলার পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, বেজা, বেপজা, বিমানবন্দর উন্নয়নসহ বেশ কিছু বড় প্রকল্পেও শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সম্পৃক্ততা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।
সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যাপক সংখ্যক মামলা হয়েছে। শুধু জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে সাবেক আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ১৪৪টি মামলা হয়েছে। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ৪৪ জন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে কমিশন গ্রহণ এবং ব্যাংক জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব প্রভাবশালীরা দেশ–বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই এখন সেই সম্পদ বিক্রি করে ফেলতে চাইছেন। দুদক এ বিষয়ে আদালতের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করেছে। যেমন, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর রয়েছে ৫৮০টি বাড়ি—এর মধ্যে ৩৪৩টি যুক্তরাজ্যে, ২২৮টি আমিরাতে এবং ৯টি যুক্তরাষ্ট্রে। বসুন্ধরা গ্রুপের দুই ভাইস চেয়ারম্যান, তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও তাঁর স্ত্রীর দেশ-বিদেশের সম্পদও জব্দ করা হয়েছে।
দুদক দাবি করছে, এখন তারা কোনো রাজনৈতিক ইশারায় কাজ করছে না, বরং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিচ্ছে। সংস্থার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এখন যারা ক্ষমতায় আছে, তাঁদের বিরুদ্ধেও যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসে, তা হলে অনুসন্ধান করা হবে।
তবে দুদকের ভেতরের একাধিক সূত্র মনে করে, অনেক মামলায় দ্রুততার সঙ্গে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, যেটা ভবিষ্যতে আদালতে অপরাধ প্রমাণে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তারা মনে করে, আরও গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে মামলা করলে শাস্তি নিশ্চিত করা সহজ হতো।
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে থাকায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে দুদক কাজ করতে পারছে। তবে তদন্তের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলে এর প্রভাব পড়বে বিচারিক প্রক্রিয়ায়। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে দুদক সক্রিয় থাকে না—এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। সঠিক প্রমাণ ও পেশাদার তদন্ত ছাড়া বড় দুর্নীতিবাজদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এই মুহূর্তে দেশের দুর্নীতি দমন কার্যক্রমে দুদক যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে, তা নজরকাড়া হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে আইনি প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার ওপর। বাস্তব প্রমাণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অবস্থানই পারে এই প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে।

