বাংলাদেশের আর্থিক খাতের এক সময়ের পরিচিত মুখ, অর্থনীতিবিদ এবং জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল বারকাত অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) গভীর রাতে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার নিজ বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দীর্ঘদিন ধরে চলা তদন্ত এবং বিতর্কের পর তাঁর গ্রেপ্তার দেশের ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক মহলে বড় ধরনের আলোড়ন তুলেছে।
অধ্যাপক বারকাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় একটি বিশাল অর্থ জালিয়াতি ও আত্মসাতের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অ্যাননটেক্স গ্রুপ নামের একটি তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানকে ভুয়া কাগজপত্র ও জমির অতিমূল্যায়নের মাধ্যমে ঋণ প্রদান করা হয়, যার পরিমাণ দাঁড়ায় ২৯৭ কোটি টাকা। এই অর্থের সিংহভাগই কোনো দিন ফেরত আসেনি।
এই ঘটনায় গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি মামলা করে, যেখানে অধ্যাপক বারকাতসহ মোট ২৩ জনকে আসামি করা হয়। মামলার অন্যতম আসামি হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। অভিযোগ অনুযায়ী, আতিউর ও বারকাত মিলে অ্যাননটেক্স গ্রুপের ২২টি কোম্পানিকে অবৈধভাবে এই ঋণ অনুমোদন করেন। দুদক বলছে, পরস্পর যোগসাজশে তারা এই টাকা ‘লুটে’ নিয়েছেন নানা অনৈতিক উপায়ে।
পুলিশ সূত্র জানায়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ধানমন্ডির ৩ নম্বর সড়কের একটি বাসায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে থেকে অধ্যাপক বারকাতকে আটক করে মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, “দুদকের মামলার ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তের প্রয়োজনে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”
অধ্যাপক আবুল বারকাত একজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং একসময় ছিলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি। ২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তাঁকে তিন বছরের জন্য জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাঁর মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়।
তবে তাঁর নেতৃত্বেই এক সময়কার মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো জনতা ব্যাংক আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে বলে বহু অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক বিশেষজ্ঞ অভিযোগ করেছেন। ওই সময়েই একাধিক অনিয়ম, ভুয়া জামানতের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অযোগ্য উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে।
দুদক জানিয়েছে, এই মামলার তদন্তে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জমির অতিমূল্যায়ন, মূল্যায়ন প্রতিবেদন জালিয়াতি, ব্যাংকিং নিয়ম ভঙ্গ এবং সরাসরি ঋণ অনুমোদনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে আসামিদের বিরুদ্ধে। দুদক আরও বলেছে, এই চক্র পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করেছে এবং এতে দেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থা সংকট তৈরি হয়েছে।
এই মামলায় অধ্যাপক বারকাত ও আতিউর রহমান ছাড়াও জনতা ব্যাংকের সাবেক পরিচালক জামাল উদ্দিন আহমেদ, ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং অ্যাননটেক্স গ্রুপের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে। সব মিলিয়ে মামলায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, প্রতারণা ও রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, “এটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ,” আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, “দীর্ঘদিন পর কেন এই পদক্ষেপ?” অনেকেই মনে করছেন, এত বড় আর্থিক অনিয়মে এত উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে যে, দেশে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কতটা দুর্বল ও রাজনৈতিক প্রভাবাধীন হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং ব্যাংক চেয়ারম্যান—তিনটি পরিচয়ের বিপরীতে আজ অধ্যাপক আবুল বারকাত একজন জালিয়াতির মামলার প্রধান আসামি। এ ঘটনা শুধু একটি ব্যাংকের দুর্নীতি নয়, বরং গোটা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর এক বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন টেনে দিয়েছে।
এই মামলা এবং গ্রেপ্তারি হয়তো একটি বড় জালিয়াতির বিচারিক প্রক্রিয়ার শুরু, তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই ধরনের অনিয়ম কেন এতদিন ধামাচাপা পড়ে থাকে? এবং ভবিষ্যতে এর প্রতিকার কী?

