রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক সংস্কারে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আলাদা সচিবালয় গঠনের প্রস্তাব উঠেছে। এটি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার রক্ষায় বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিষয়টিতে রাজনৈতিক ঐকমত্যও দেখা যাচ্ছে, যা বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায় উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে—তা হলো একটি স্বাধীন ও দায়বদ্ধ অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা।
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা আদালতে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়ানি মামলায় অংশ নেন গভার্নমেন্ট প্লিডার (জিপি) এবং ফৌজদারি মামলায় পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি)। এদের অধীনে সহকারী ও অতিরিক্ত জিপি-পিপিরা দায়িত্ব পালন করেন। আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর উইং থেকে এল.আর. ম্যানুয়াল ১৯৬০ ও ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯২ ধারা অনুযায়ী এদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে এসব নিয়োগ হয়ে থাকে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পছন্দের ভিত্তিতে।
জিপি ও পিপিরা রাষ্ট্রের পক্ষে মৌখিক ও লিখিত সাক্ষ্য উপস্থাপন করে মামলার নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে যখন মামলার পক্ষ কোনোভাবে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হয়, তখন নিরপেক্ষভাবে কাজ করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া তারা প্রয়োজনীয় সম্মানজনক পারিশ্রমিক পান না, যা কাজের অনীহা ও অদক্ষতা তৈরি করে। এর ফলে কখনও litigant বা মামলার পক্ষ থেকে অর্থ গ্রহণের ঘটনাও ঘটে। এটি বাংলাদেশের আদালত অঙ্গনে বিরল নয়। ফলে এ ধরনের অস্থায়ী ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রসিকিউশন ব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। বিশ্ব জাস্টিস প্রজেক্টের (WJP) ২০২৪ সালের সূচকে বাংলাদেশ ১৪২টি দেশের মধ্যে ১২৭তম এবং মোট স্কোর ০.৩৯ পেয়েছে—যা বিচারব্যবস্থার সংকট স্পষ্ট করে।
জাতিসংঘের ‘Guidelines on the Role of Prosecutors’ (৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৯০) অনুসারে, প্রসিকিউটর নিয়োগ হতে হবে যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতে। এতে পক্ষপাতদুষ্ট নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং নির্ভীক ও স্বাধীন প্রসিকিউশন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক নির্দেশনাকে মানদণ্ড হিসেবে ধরলে বাংলাদেশের বর্তমান প্রসিকিউশন ব্যবস্থা প্রশিক্ষণ, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতার ঘাটতিতে ভুগছে। ফলে রাষ্ট্র কাঙ্ক্ষিত বিচারিক ফল পাচ্ছে না।
বিচার সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছে, অধস্তন ও উচ্চ আদালতের জন্য স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের। একই প্রস্তাব ছিল অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও। সেখানে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে ৭০% চুক্তিভিত্তিক আইনজীবী ও ৩০% আইন ডিগ্রিধারীকে বিচারিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দিয়ে একটি আলাদা প্রসিকিউশন সার্ভিস গঠনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কার চলমান। এখন সময় এসেছে জেলা পর্যায়ে একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের। এতে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অনুযায়ী লোকবল নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। শুরুতে একটি অংশ Judicial Service Commission-এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। বাকি অংশে অভিজ্ঞ পেশাদারদের নিয়োগ বর্তমান ব্যবস্থার অনুরূপভাবে চলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য হবে সারাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ও পেশাদার প্রসিকিউশন সার্ভিস প্রতিষ্ঠা।
স্বতন্ত্র ও স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস চালু হলে জনস্বার্থে দায়বদ্ধ একটি শক্তিশালী প্রসিকিউটর গোষ্ঠী গড়ে উঠবে। এতে মানুষ হয়রানির ভয় ছাড়াই ন্যায়বিচার চাইতে পারবে। একইসঙ্গে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ও শ্রদ্ধা বাড়বে।

