বগুড়ায় মাদকবিরোধী মামলাগুলোতে এক বছরের ব্যবধানে দেখা গেছে গুরুতর বিচ্যুতি।
২০২৪ সালে জেলার আদালত ১ হাজার ৪টি মাদক মামলার রায় ঘোষণা করেছে। তবে এর মধ্যে ৬৬৫টি মামলায় পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সাক্ষ্য দিতে অনুপস্থিত ছিলেন বা সঠিকভাবে সাক্ষ্য দেননি। ফলে এসব মামলায় ৯৩৬ জন আসামি খালাস পেয়ে যান।
আদালত সূত্র জানায়, এই মামলাগুলোতে মোট আসামির সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৫১ জন। এজাহারকারী ও তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন মূলত পুলিশ, র্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। তবে মামলার নিষ্পত্তিতে দেখা গেছে, প্রমাণ উপস্থাপনের দায়ভার যাঁদের ওপর, তাঁরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত ছিলেন বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।
২২ মামলায় পুলিশ-র্যাবের ৪৪ কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেননি
২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত করা এই ১ হাজার ৪টি মামলার মধ্যে ২২টি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও বাদী আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেননি। জব্দ তালিকার সাক্ষীরাও আদালতে হাজির হননি কিংবা এলোমেলো বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে এসব মামলায় বিচারক অভিযোগ খারিজ করে দেন।
এই অবস্থায় বগুড়ার আদালত পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে ২২টি মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের (আইও) ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। একইসঙ্গে বাদীদের প্রতিও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ আসে।
‘আদালতের বিষয়ে মন্তব্য নয়’
বগুড়ার পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা বলেন,
“আদালতের রায় নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।”
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতির বিষয়ে তিনি বলেন,
“এটি পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করছি।”
জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল বাছেদ ঘটনাটিকে “দুঃখজনক” বলে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন,
“প্রায় ১ হাজার আসামির খালাস পাওয়ার ঘটনা বিচার ব্যবস্থার জন্য লজ্জাজনক। তবে দায় শুধু পুলিশের নয়। তদন্ত কর্মকর্তারা ব্যর্থ ছিলেন, পাশাপাশি মামলার পক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তারাও দুর্বল ছিলেন।”
তিনি আরও জানান,
“গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তাদের নিয়োগ পাওয়া আইন কর্মকর্তারা দায়িত্বে ছিলেন ২২ অক্টোবর পর্যন্ত। আমরা দায়িত্ব নিই ২৩ অক্টোবর। এর আগে যেসব মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানি শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেখানে আমাদের কিছু করার ছিল না।”
বছরের পর বছর ধরে মাদকবিরোধী যুদ্ধের কথা বলছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তবে বগুড়ার এই বাস্তবতা দেখাচ্ছে, প্রক্রিয়াগত গাফিলতিতে সেই লড়াই অনেকটাই ধসে পড়ছে। সঠিক সাক্ষ্য নেই, জব্দ তালিকা নেই, তদন্তেও দুর্বলতা। ফলে আসামিরা বারবার খালাস পাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু বিচার ব্যবস্থারই ব্যর্থতা নয়—পুরো আইন প্রয়োগ ব্যবস্থারও এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।

