জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর প্রায় পার হয়ে গেলেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এখনও আওয়ামী আমলে গঠিত বিতর্কিত আইনজীবী প্যানেল বদলাতে পারেনি। এতে দুদকের দুর্নীতিবিরোধী তদন্তে গতি থাকলেও মামলার বিচারপ্রক্রিয়া থমকে আছে।
সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা ও বাদীদের অভিযোগ, অনেক প্যানেল আইনজীবী শুনানিতে অংশ নিচ্ছেন না। কেউ কেউ আদালতে উপস্থিতই হন না। ফলে মামলার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্তমানে জেলা ও উচ্চ আদালতে দুদকের মামলার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত প্যানেল আইনজীবীর সংখ্যা ১৩৫। এদের সবাই আওয়ামী লীগ শাসনামলে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
দুদক সূত্র জানায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন প্যানেল গঠনের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু সাড়ে চার মাস কেটে গেলেও প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বারবার বলা হচ্ছে, ‘হচ্ছে, হয়ে যাবে’। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হচ্ছে না।
কমিশনের আইন শাখা জানিয়েছে, বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীদের তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল। তবে তেমন সাড়া মেলেনি। যেসব আবেদন জমা পড়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।
নতুন করে প্যানেলে আসতে ইচ্ছুক কয়েকজন আইনজীবী জানান, আবেদন প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ করা কঠিন। আবেদন করতে গেলে রায়ের সনদসহ বহু নথি জমা দিতে হয়। এতে অর্থ ও সময় দুই-ই ব্যয় হয়। অনেকেই এ প্রক্রিয়াকে অপ্রয়োজনীয় এবং নিরুৎসাহমূলক মনে করছেন।
অন্যদিকে, দুদকের বিভিন্ন মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, আগের প্যানেলের অনেক আইনজীবী দায়িত্বহীন আচরণ করছেন। কেউ কেউ আদালতে একেবারেই অনুপস্থিত। শোনা যাচ্ছে, এদের বড় একটি অংশই আওয়ামী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং তৎকালীন আইনমন্ত্রীর সুপারিশে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের পর থেকেই এ ১৩৫ জন আইনজীবীর মধ্যে মাত্র ৩–৪ জন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। বাকিরা এখনো বহাল আছেন। অনেকে আদালতে অনিয়মিত বা একেবারেই অনুপস্থিত। প্রধান প্যানেল আইনজীবী খোরশেদ আলম খান দীর্ঘদিন ধরেই আসছেন না। মোশাররফ হোসেন কাজলসহ আরও অনেকে কার্যত অদৃশ্য। কেউ কেউ সরাসরি আওয়ামী আইনজীবী ফোরামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গণ-অভ্যুত্থানের পর তাঁদের কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে গেছেন।
দুদক প্রধান কার্যালয়ের একজন পরিচালক এবং তিনজন উপপরিচালক জানান, আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রুজু হয়েছে। গ্রেপ্তারও হয়েছে অনেকে। হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক ও জব্দের আদেশ মিলেছে। কিন্তু মামলার বিচার হচ্ছে না। কারণ—আইনজীবীদের অসহযোগিতা।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, প্যানেল গঠনের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও এখনো নিয়োগ চূড়ান্ত হয়নি। যিনি আইনি প্রক্রিয়াটি দেখভাল করতেন, তিনি বদলি হয়ে গেছেন। নতুন কেউ এখনো দায়িত্বে আসেননি। ফলে বিলম্ব হচ্ছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিগগিরই বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সেক্রেটারি ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস বলেন, “দুদক যদি গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে তা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। যারা শহীদ হয়েছেন, তারা লুটপাটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এমন ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে ১১ মাসেও প্যানেল বদলাতে না পারা হতাশাজনক।”
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী কামরুল হাসান সজল বলেন, “গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর হতে চলেছে। এখনো যদি দুদক আওয়ামী লুটপাটের একটি মামলারও বিচার শেষ না করতে পারে, তাহলে সেটি হবে শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি। জাতির কাছে আমাদের জবাবদিহি থাকবে।”

