ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের আইনি অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দীর্ঘকাল তিনি দেশের প্রধান প্রধান মামলায় নেতৃত্ব দিয়ে বিচারব্যবস্থার উন্নয়নে গুরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি একজন বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ছিলেন।
সৈয়দ ইশতিয়াক ১৯৩২ সালের ১৮ জানুয়ারি গাজীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জমিদার ও ব্যবসায়ী সৈয়দ জাফর আহমেদ। তিনি হিলির রামানাথ ইংরেজি হাইস্কুল এবং কলকাতা মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে পরিবারসহ পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। ১৯৪৮ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৫০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আই.এ এবং ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও ১৯৫৪ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৫৮ সালে ইংল্যান্ডে লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল এবং লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিকস থেকে এমএসসি ডিগ্রি নেন।

ছাত্রজীবনে ইশতিয়াক আহমেদ মুকুল ফৌজ ও ব্রতচারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৬ সালে ভারত সরকারের কঠোর শাস্তির প্রতিবাদে কলকাতায় বিক্ষোভে অংশ নেন এবং গ্রেপ্তার হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি দুইবার কারারুদ্ধ হন। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সরকারের ছাত্রসভা বন্ধের প্রতিবাদ কমিটিতে অংশ নেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নর জেনারেলের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তৃতীয়বার কারাগারে যান।
১৯৬০ সাল থেকে ইশতিয়াক আহমেদ আমৃত্যু আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শাস্ত্রের খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭২ সালে অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এবং ১৯৭৬ সালে এটর্নি জেনারেল নিযুক্ত হন।
তিনি দুইবার সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি (১৯৭৮-১৯৭৯, ১৯৮৯-১৯৯০) ও দুইবার বার কাউন্সিলের অর্থনৈতিক কমিটির সদস্য (১৯৭৯-১৯৮২, ১৯৮৯-১৯৯২) নির্বাচিত হন। ১৯৭৭ সালে কোম্পানি আইন সংস্কার কমিটির চেয়ারম্যান হন। ১৯৮১ সালে তার প্রণীত প্রতিবেদনে ১৯১৩ সালের কোম্পানি আইনের উল্লেখযোগ্য সংস্কারের প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল’ অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের বিকল্প চেয়্যারম্যান (১৯৮৫-১৯৯১) এবং পরে (১৯৯২-২০০৩) চেয়্যারম্যান ছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও চেয়ারম্যান ছিলেন।
সৈয়দ ইশতিয়াক আন্তর্জাতিক মঞ্চেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও মালদ্বীপের জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। চৌদ্দ দশকের আইন পেশায় বিশেষ করে সিভিল ও সংবিধানিক আইনে তার খ্যাতি ছিল অপরিসীম। সুপ্রিম কোর্ট তাকে ‘অ্যামিকাস কিউরি’ নামে অভিহিত করেছিল। ৮ম সংশোধনী বাতিলের জন্য তিনি নেতৃত্ব দেন। ১৯৮৯ সালে এই সংশোধনী আদালতের অখণ্ডতা রক্ষা করে বাতিল হয়।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে তিনি সক্রিয় ছিলেন। ১৯৯০ ও ১৯৯৬ সালে সরকারি নির্দেশে কয়েকটি সাপ্তাহিক ও দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ বন্ধের বিরুদ্ধে আদালতে সফল রায় নিশ্চিত করেন। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে তিনি দৃঢ় অবস্থান নেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৮৩ ও ১৯৮৭ সালে কারাভোগ করেন। ১৯৯১ সালে নির্বাচিত সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এবং সংসদীয় শাসনের পথে সংবিধান সংশোধনে তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা ও বাস্তবায়নে তিনি ভূমিকা রাখেন। ১৯৯৫ সালে সাপ্তাহিক যায় যায় দিন তাকে ‘ডেমোক্রাসি অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার এবং ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। এই সময় বিচার বিভাগকে নির্বাহী থেকে আলাদা করার কাজ করেন।
আইনজীবীর পাশাপাশি তিনি সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠনে সক্রিয় ছিলেন। ঢাকা নর্থ রোটারি ক্লাবের সভাপতি (১৯৭০-১৯৭১) ছিলেন। বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ও বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের আজীবন সদস্য ছিলেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য ছিলেন।

