কুষ্টিয়ার ফিলিপনগরের সাম্প্রতিক ঘটনা দেশের সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংঘবদ্ধ একদল মানুষের হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পাশাপাশি সুফি সাধক জাহাঙ্গীর শামীমকে তার দরবারে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা নিজেদের ‘তৌহিদি জনতা’ হিসেবে পরিচয় দেয়। ঘটনাটি আকস্মিক নয়, বরং একাধিক লক্ষণে এটি পূর্বপরিকল্পিত বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো দৃষ্টান্ত নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতা বা ‘মব সন্ত্রাস’ নামে পরিচিত ঘটনাগুলো ক্রমশ বাড়ছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, আইনশৃঙ্খলা কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে সংঘবদ্ধ সহিংসতার এই প্রবণতা সমাজে এক ধরনের নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। অতীতে বিশেষ রাজনৈতিক সময়কে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতিকে কেউ কেউ ‘মবতন্ত্র’ বলেও অভিহিত করেছেন, যা মূলত রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে জনতার নামে সহিংসতার বিস্তারকে নির্দেশ করে।
পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। ২০২৫ সালে সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতায় অন্তত ১৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মৃত্যু অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশ্যে ঘটেছে এবং কিছু ঘটনায় প্রশাসনের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে আইনের শাসনের প্রতি জনআস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
এই সহিংসতার একটি বড় অংশ ধর্মীয় আবেগ, গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্যকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি বাউল ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের ওপর হামলার অভিযোগও পাওয়া গেছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বইমেলা ও নাট্য আয়োজনেও বাধা দেওয়ার ঘটনা বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনার অনেকগুলোতেই ‘তৌহিদি জনতা’ নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি উগ্রবাদী প্রবণতা ধর্মীয় ব্যাখ্যার আড়ালে দেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও সামাজিক বৈচিত্র্যকে চাপের মুখে ফেলতে চায়। তাদের লক্ষ্য শুধু সাংস্কৃতিক চর্চা নয়, বরং সমাজের বহুমাত্রিক মত ও পথের প্রকাশকে সীমিত করা—এমন অভিযোগও উঠছে।
অন্যদিকে, এই ধরনের মব সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব বা নীরব সমর্থনের অভিযোগও বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে। কোনো কোনো সময় রাজনৈতিক বক্তব্য বা অবস্থান এই সহিংসতাকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট ও নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ফলে তৎকালীন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর ছিল, নাকি কোথাও সমঝোতা বা নীরবতা ছিল—এই প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত। এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়েছে, যারা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল, মব সহিংসতার অবসান ঘটবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও বিভিন্ন সময় সরকার ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
গত কয়েক দিনে কুষ্টিয়া ও রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় সংঘটিত ঘটনাগুলো আবারও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে কুষ্টিয়ার ঘটনা রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এখন মূল প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র এই ধরনের সংঘবদ্ধ সহিংসতার বিরুদ্ধে কতটা কঠোর অবস্থান নিতে পারবে। নাকি অতীতের মতোই নীরবতা বা দুর্বল প্রতিক্রিয়ার চক্র চলমান থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মব সন্ত্রাস কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক সমাজের অংশ হতে পারে না। এটি সরাসরি আইনের শাসনের পরিপন্থী। তাই ধর্ম, সংস্কৃতি বা অন্য কোনো অজুহাতে সংঘবদ্ধ সহিংসতাকে সহ্য করার সুযোগ নেই। এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক কঠোরতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ একসঙ্গে গড়ে তুলতে হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ করা সরকারের জন্য এখন অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এই সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নেওয়া। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে যারা এই ধরনের সহিংসতাকে সমর্থন বা উৎসাহ দেয়, তাদের ক্ষেত্রেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে রক্ষা করা যাবে কি না। কারণ সুফি, বাউল, সাধক ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারাই দেশের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বৈচিত্র্য রক্ষা করা শুধু সংস্কৃতির বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। যদি মব সহিংসতার এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। সূত্র: সমকাল

