রাজধানী ঢাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা এখন শুধু রাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং দিনের আলোতেও তা ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। ব্যাংকপাড়া থেকে শুরু করে বাসার গলি, মার্কেট কিংবা বিনোদনকেন্দ্র—সবখানেই সুযোগ পেলেই সর্বস্ব লুট করে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ বাড়ছে। কেউ বাধা দিতে গেলে অস্ত্র ব্যবহার, এমনকি গুলি চালানোর মতো ঘটনাও ঘটছে বলে জানা যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাস্তায় বের হলেই এক ধরনের অজানা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই ছড়িয়ে পড়ছে ছিনতাইয়ের ভয়াবহ দৃশ্যের ভিডিও, যা নগরবাসীর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সবশেষ ঘটনা ঘটে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে। প্রকাশ্য দিবালোকে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা ও ডলার ছিনিয়ে নেওয়ার সময় গুলিও চালানো হয় বলে জানা যায়। এই ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসে। তবে ঘটনার দুই দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট অগ্রগতি জানাতে পারেনি তারা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের সূত্র জানায়, মতিঝিলের ঘটনার পর কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে রাজধানীর সব থানায় কঠোর নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। সেখানে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল এবং চেকপোস্ট কার্যক্রম বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে। জামিনে থাকা দাগি অপরাধীদের তথ্য সংগ্রহ করে, কেউ নতুন করে অপরাধে জড়ালে তাকে আইনের আওতায় আনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশ যে হারে গ্রেপ্তার ও মামলা করছে, তাতে ছিনতাই কমে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে উল্টো ছিনতাইকারী ও ছিনতাইয়ের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। তার ভাষায়, মামলার বিবরণে অনেক সময় অপরাধীদের জামিন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, এখন ছিনতাইকারীরা সংগঠিত চক্রে পরিণত হয়েছে এবং তারা অস্ত্র নিয়ে মানুষের সর্বস্ব লুট করছে। তাই মামলা ও জামিন প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।রাজধানীতে এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
রাজধানীতে ছিনতাই চক্রে যুক্ত ১,৩৮৭ জন সক্রিয়:
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি বিভাগে বর্তমানে তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৩৮৭ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। ছয় মাস আগেও এই সংখ্যা ছিল ৯৮৯। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা প্রায় দেড় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, রমনা বিভাগে ১৫২ জন, লালবাগে ১৫৯ জন, ওয়ারীতে ৩০৮ জন, মতিঝিলে ১৬৮ জন, তেজগাঁওয়ে ২৪০ জন, মিরপুরে ৫৩ জন, গুলশানে ৬৭ জন এবং উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন ছিনতাইকারী তালিকাভুক্ত রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তালিকাভুক্তদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই এক থেকে সাতটি মামলার আসামি। এদের অনেকেই একাধিকবার গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে আবারও ছিনতাই কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি প্রতিদিনই নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে এই অপরাধ চক্রে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের বাইরেও রাজধানীতে আরও এক হাজারের বেশি সক্রিয় ছিনতাইকারী রয়েছে। তাদের একটি বড় অংশ ভাসমান কিশোর এবং মাদকাসক্ত বলে জানা গেছে। তারা সুযোগ পেলেই ছুরি, চাপাতি বা সামুরাইয়ের মতো ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটাচ্ছে। এদিকে, ছিনতাইকারীদের সংখ্যা ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
হটস্পটেই বাড়ছে ছিনতাই, মামলা গ্রহণে অনীহা:
রাজধানী ঢাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা মূলত নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে বলে পুলিশের পরিসংখ্যানেই উঠে এসেছে। শহরে মোট তিন শতাধিক ছিনতাই স্পট থাকলেও এর মধ্যে ৫৫টি এলাকাকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব হটস্পটেই নিয়মিত ঘটছে একের পর এক ছিনতাই।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে রাজধানীতে ৮৩টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। মার্চ ও এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে এ সংখ্যা বেড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, এপ্রিলে রাজধানীতে ২৫টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে তেজগাঁওয়ে ৯টি, মতিঝিল, গুলশান ও ওয়ারীতে ৪টি করে এবং রমনা ও লালবাগে ২টি করে ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, তেজগাঁও এলাকাই ছিনতাইয়ের শীর্ষ হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত। এর পর রয়েছে মতিঝিল ও ওয়ারী। হটস্পট চিহ্নিত হওয়ার পরও সেখানে ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে না আসায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
এদিকে পুলিশের হিসাবে সব ঘটনা পুরোপুরি প্রতিফলিত হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় মোবাইল ফোন বা মানিব্যাগ হারালে ভুক্তভোগীরা সাধারণত হারানো জিডি করেই বিষয়টি শেষ করেন। ফলে প্রকৃত ছিনতাইয়ের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে থানায় মামলা গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার সহজে মামলা নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকর হচ্ছে না বলে দাবি উঠেছে। গত ৯ এপ্রিল মতিঝিল এলাকায় জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাইয়ের শিকার হন ব্যাংকার মো. মামুনুর রশিদ। অভিযোগ অনুযায়ী, দুই ছিনতাইকারী পিস্তল ঠেকিয়ে তার কাছ থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫০০ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে অটোরিকশায় আরামবাগের দিকে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর মামলা করতে তাকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক মাস পর এবং ঊর্ধ্বতন পুলিশের সুপারিশের পর থানা মামলা গ্রহণ করে। মামলার এজাহারও তার বদলে থানার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লেখা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
মামুনুর রশিদ জানান, ঘটনার সময় কাছেই পুলিশের একটি টহল গাড়ি থাকলেও তারা ছিনতাইকারীদের ধাওয়া না দিয়ে তাকে থানায় যেতে বলে। পরে থানায় অভিযোগ দিতে গেলে নানা ধরনের জটিলতা দেখানো হয় বলে তার অভিযোগ। সিসি ক্যামেরার ফুটেজসহ তথ্য নিয়েও মামলা নিতে দেরি করা হয় বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, মামলায় অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করতে দেওয়া হয়নি। অস্ত্রের ধরন নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন তোলা হয়। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে তিনি বিষয়টি কিছুটা পরিবর্তন করলেও প্রায় এক মাস পর ৫ মে মামলা রুজু হয়। তবে এখনো তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই বলে দাবি তার। এ বিষয়ে মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান তালুকদার বলেন, “ভুলের ঊর্ধ্বে কেউ না। আমারও ভুল থাকতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে কঠোর বার্তা ডিএমপি’র:
ছিনতাইসহ যেকোনো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত বিশেষ অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ছিনতাইসহ যেকোনো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তবে শতভাগ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না। যারা বাইরে থেকে যায়, তারা সুযোগ পেয়ে দুয়েকটি ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। তিনি আরও বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া অনেক অপরাধী কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। ডিএমপির সব থানায় কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। সক্রিয় ছিনতাইকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি জামিনে থাকা অপরাধীদের বর্তমান অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

