সিলেট নগরীতে নির্মল হাঁটাহাঁটি ও বিনোদনের জন্য তৈরি করা ওয়াকওয়েগুলো এখন অনেকের কাছেই আতঙ্কের জায়গা হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যা নামলেই এসব দৃষ্টিনন্দন স্থাপনায় সক্রিয় হয়ে ওঠে কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী চক্র এবং মাদক কারবারিরা। বিশেষ করে নারীরা ও তরুণীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন বলে অভিযোগ বাড়ছে।
নগরীর ছয়টি ছড়া এবং একটি দিঘির পাশে প্রায় শতকোটি টাকা ব্যয়ে এসব ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। ২০১৭ সালে নগর সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে এই প্রকল্প শুরু হয়। প্রথম দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে গড়ে ওঠে নগরীর প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজারের জল্লারপাড় এলাকায়। শুরুতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এখানে নির্বিঘ্নে হাঁটাচলা করতেন সাধারণ মানুষ।
পরবর্তীতে ধাপে ধাপে কালীবাড়ি ছড়া, সাগরদীঘির পাড়, বালুচর গোয়ালীছড়া, টিলাগড় এলাকার হাতিম আলী স্কুল সংলগ্ন ছড়া, উপশহরের একটি ছড়া এবং ধোপাদীঘির চারপাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব জায়গার চিত্র বদলে যেতে থাকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ধোপাদীঘি, জল্লারপাড় ও উপশহর এলাকার ওয়াকওয়েতে এখন ভ্রাম্যমাণ মাদক কারবারিদের আনাগোনা নিয়মিত। নির্দিষ্ট ক্রেতাদের কাছে সেখানে ইয়াবা ও গাঁজার মতো মাদক বিক্রি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে কালীবাড়ি ছড়া ও বালুচর গোয়ালীছড়া এলাকায় ভোর ও সন্ধ্যার পর ছিনতাই ও মাদক বাণিজ্যের আড্ডা বসে।
সাগরদীঘির পাড় ওয়াকওয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কিশোর গ্যাং ও ছিনতাই চক্রের কারণে। কয়েকদিন আগে সেখানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ছিনতাইয়ের চেষ্টার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব ওয়াকওয়েতে বিভিন্ন বয়সের মানুষ ঘুরতে ও আড্ডা দিতে আসেন। কিন্তু এই ভিড়কে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সন্ধ্যার পর কোনো তরুণী পরিবার বা বন্ধুর সঙ্গে সেখানে গেলে তাদের আটকে হেনস্তা করা হয়। কখনও অসামাজিকতার অভিযোগ তুলে টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এ বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. মনজুরুল আলম জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে সাগরদীঘির পাড় ওয়াকওয়েতে এক দম্পতিকে ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। কিছু যুবক তাদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং অসামাজিকতার অভিযোগে হেনস্তা করে। এ সময় টহল পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তিনজনকে আটক করা হয়।
এর আগের দিন বুধবার রাতে ওসমানী মেডিকেল কলেজের এক ছাত্র ও ছাত্রীকেও একইভাবে হেনস্তা করে টাকা দাবি করা হয়। ওই ঘটনায় একজন কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সিলেট কোতোয়ালি থানার ওসি খান মোহাম্মদ মাইনুল জাকির বলেন, ওয়াকওয়ে এলাকাগুলোতে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যাতে সাধারণ মানুষ নিরাপদে হাঁটতে ও সময় কাটাতে পারেন এবং কেউ অপরাধীদের শিকার না হন, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।
শহরের সৌন্দর্য বাড়াতে গড়ে তোলা এই ওয়াকওয়েগুলো এখন নিরাপত্তা সংকটের মুখে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—বিনোদনের এই স্থানগুলো কি আবারও মানুষের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠতে পারবে?

