মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অধীন সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত ‘পিডিএস’ সফটওয়্যারকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংবেদনশীল তথ্য একটি বেসরকারি আইটি ফার্মের নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
মাউশি সূত্র জানায়, পিডিএস সফটওয়্যারটি অধিদপ্তরের আওতাধীন আঞ্চলিক কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস, সরকারি কলেজের স্কুল শাখা এবং সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে তাদের বর্তমান কর্মস্থল, ব্যক্তিগত তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির ইতিহাসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। একই সঙ্গে এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীরা নিজেদের তথ্য হালনাগাদ, সংরক্ষণ এবং বদলির আবেদনও করতে পারেন।
সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ৭০০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের তথ্য এই সফটওয়্যারে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে স্কুল ইনফরমেশন ব্যাংক (এসআইবি) ব্যবস্থায় দেড় শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তথ্য যুক্ত হয়েছে। বাকি বিদ্যালয়গুলোর তথ্য দ্রুত হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি মাউশি দেশের সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের কাছে পাঠানো এক নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের আর্থিক ও প্রশাসনিক তথ্য স্বচ্ছভাবে সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্ম http://automation.sib.gov.bd ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে। এতে নির্ধারিত ছকে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন তথ্য ইনপুট দিতে বলা হয়েছে।
মাউশি আরও দাবি করেছে, পিডিএস সফটওয়্যারটি শিক্ষা প্রশাসনের কাজের গতি বাড়িয়েছে। বাজেট সংকটের কারণে সরকারি অর্থে সফটওয়্যারটি তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে করপোরেট সিস্টেম সলিউশন (সিএসএস) নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এটি বিনামূল্যে তৈরি করে দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। শুধুমাত্র সরকারি সার্ভার ব্যবহারের ভিত্তিতে ২০২৫ সাল থেকে তিন বছরের জন্য তাদের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সিএসএস নামের প্রতিষ্ঠানটি সরকারি ডাটাবেজ ব্যবহার করে নিজেদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বিস্তৃত করছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসআইবির কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ ব্যবহার করে তারা বিদ্যালয় অটোমেশন, পরীক্ষার ফল প্রস্তুতসহ বিভিন্ন সেবা পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ‘পাঠশালা’ নামে তাদের আরেকটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্কুল ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে আরও অভিযোগ রয়েছে, সিএসএসের নির্বাহী পরিচালক সরদার আনিস আহমেদ এসআইবি প্রকল্পের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যক্তিগত ইমেইল ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে ‘পাঠশালা’ সফটওয়্যার প্রচারের ক্ষেত্রেও ওই একই যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন স্কুলে প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে। এতে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ।
কয়েকটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, পিডিএস সফটওয়্যারে কারিগরি সহায়তা হিসেবে সিএসএসের নাম উল্লেখ থাকায় তারা এটিকে সরকারি অনুমোদিত সেবা হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় তারা এটি ব্যবহার শুরু করেন। তবে এখন তারা মনে করছেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এত বিপুল পরিমাণ তথ্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকা উদ্বেগজনক। অন্যদিকে সিএসএস দাবি করছে, তাদের ‘পাঠশালা’ সফটওয়্যার এসআইবি ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে এবং এর মাধ্যমে স্কুলগুলো সহজে ফলাফল তৈরি, রিপোর্টিংসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করতে পারবে।
সূত্র মতে, বিদ্যালয় অটোমেশন সফটওয়্যারের আওতায় শিক্ষার্থী প্রতি মাসে ২ টাকা সার্ভিস চার্জ আদায় করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি এসএমএসের জন্য ৩৭ পয়সা, ডোমেইন ব্যবহারের জন্য বছরে ৮৬৩ টাকা এবং ওয়েবসাইট হোস্টিংয়ের জন্য বছরে ৩ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, ইতোমধ্যে প্রায় দেড়শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই অটোমেশন ব্যবস্থার আওতায় এসেছে।
তালিকায় রাজধানীর ধানমন্ডির সরকারি বালক ও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, শেরেবাংলা নগর বালক উচ্চ বিদ্যালয়, তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, উদয়ন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, রাজশাহীর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলসহ বিভিন্ন জেলার নামকরা জিলা স্কুলও রয়েছে।
নরসিংদীর শিবপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, তারা সিএসএস থেকে আইটি সেবা নিয়েছেন। তার ভাষায়, প্রতিষ্ঠানটি স্কুলে এসে জানিয়েছে তারা মাউশি-সংশ্লিষ্ট এবং নিয়ম মেনেই সফটওয়্যার তৈরি করবে। এ কারণে তারা টাকার বিনিময়ে সেবা নিয়েছেন, তবে কত টাকা ব্যয় হয়েছে তা তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মনে করতে পারেননি। কুমিল্লার লাকসাম সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ বি এম এনায়েত উল্লাহ জানান, পিডিএস সফটওয়্যারটি সিএসএস তৈরি করে দেওয়ার পরই তারা তাদের কাছ থেকে সেবা নিয়েছেন।
এদিকে মাউশির উপপরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, একটি সরকারি বিদ্যালয়ে গড়ে অন্তত দেড় হাজার শিক্ষার্থী থাকে। বর্তমানে দেড়শ প্রতিষ্ঠান অটোমেশন ব্যবস্থায় যুক্ত হলেও দ্রুত সব প্রতিষ্ঠানকে এই প্রক্রিয়ায় আনার চাপ রয়েছে। সব প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলে শুধু শিক্ষার্থীভিত্তিক সার্ভিস চার্জ থেকেই মাসে কোটি টাকার বেশি আয় হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এর বাইরে হোস্টিং, ওয়েবসাইট ও অন্যান্য চার্জ মিলিয়ে বছরে আরও কোটি টাকার বেশি আয় হচ্ছে বলে তার ধারণা।
আরেক কর্মকর্তা বিষয়টি তুলনা করে বলেন, এটি অনেকটা বাজারে কোনো পণ্য প্রথমে বিনামূল্যে বা কম দামে দিয়ে অভ্যস্ত করানোর কৌশলের মতো। তার মতে, সিএসএস প্রথমে মাউশিকে বিনামূল্যে সফটওয়্যার দিলেও পরবর্তীতে এই কাঠামোর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে বাণিজ্য করছে।
তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সংবেদনশীল তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে। এসআইবি ডাটাবেজে শিক্ষকদের চাকরি সংক্রান্ত তথ্য, বদলি, যোগদানসহ বিস্তারিত রেকর্ড এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ও একাডেমিক তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। এসব তথ্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাউশির এক কর্মকর্তা বলেন, এই ডাটাবেজে থাকা তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। কোনোভাবে তথ্য ফাঁস হলে তা বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। এমনকি এসব তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ বিষয়ে জানতে মাউশির অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। বার্তা পাঠালেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তবে মাউশির সরকারি মাধ্যমিক শাখার উপপরিচালক মো. ইউনুছ ফারুকী বলেন, বাজেট সংকটের কারণে সিএসএস বিনামূল্যে সফটওয়্যার তৈরি করে দিয়েছে এবং তাদের সঙ্গে তিন বছরের চুক্তি রয়েছে। তিনি বলেন, কোনো অনিয়ম হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে। পাশাপাশি কোনো বিদ্যালয়কে তাদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক সেবা নিতে বলা হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন। তবে সরকারি ডাটাবেজ ব্যবহার করে বিদ্যালয় পর্যায়ে ওয়েবসাইট ও অন্যান্য সেবা বাণিজ্যের বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানান তিনি।
করপোরেট সিস্টেম সলিউশনের (সিএসএস) নির্বাহী পরিচালক সরদার আনিস আহমেদ দাবি করেছেন, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য তারা দুটি পৃথক ডাটাবেজ সফটওয়্যার তৈরি করেছেন। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য তৈরি ‘পাঠশালা’ ডাটাবেজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ন্যূনতম একটি সার্ভিস চার্জ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে কাউকে বাধ্য করা হচ্ছে না বলেও দাবি তার।
এসআইবি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি ডাটাবেজ ব্যবস্থাপনার কাজ করে, তাই সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের তথ্য নিয়ে অটোমেশনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার ভাষায়, ফলাফল তৈরির ক্ষেত্রে সরকারি স্কুল হওয়ায় সরকারি ডাটাবেজ ব্যবহার করা হয়। এদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরকারি ডাটাবেজ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া এবং বিনামূল্যে সরকারি সফটওয়্যার তৈরি করে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, সরকারি কোনো আইটি প্রকল্প বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিনামূল্যে করিয়ে নেওয়া উচিত নয়। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি তথ্যভান্ডারের তথ্য অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত নয়। তার মতে, সরকারি ডেটার অ্যাকসেস যদি বেসরকারি খাতে চলে যায়, তাহলে তথ্য নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।