দেশজুড়ে চাঁদাবাজির বিস্তার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জন্য বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত ও নির্মাণ সাইট—প্রায় সব জায়গাতেই সক্রিয় রয়েছে সংগঠিত চাঁদাবাজ চক্র। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৬৫০ জন চাঁদাবাজ গডফাদারের একটি তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। এই তালিকায় বিভিন্ন অঞ্চলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অভিযান বা কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে কার্যকারিতা নিয়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, তালিকাভুক্ত অনেকেরই রাজনৈতিক পরিচয় থাকায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ভুক্তভোগীরাও নিরাপত্তাজনিত কারণে মামলা করতে অনাগ্রহী। আবার মামলা হলেও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় ধীরগতির অভিযোগ রয়েছে। ফলে গ্রেপ্তার হলেও অনেকেই দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে একই কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছেন।
অপরাধ বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ তৌহিদুল হক মনে করেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া থাকলে চাঁদাবাজি ও দখলবাণিজ্যের মতো অপরাধ সহজে বিস্তার লাভ করে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কেবল তালিকা প্রণয়ন নয়—সেটি কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হলে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন ও ইউনিটভিত্তিক তালিকায় কিছু এলাকায় চাঁদাবাজদের উপস্থিতি বেশি। শিল্প ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে এই প্রবণতা তুলনামূলকভাবে তীব্র। তবে এসব তথ্য গোপনীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে প্রমাণ সংগ্রহ ও আইনি প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। তবুও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, হাসপাতাল, বাজার কিংবা নির্মাণকাজে চাঁদা না দেওয়ায় হামলার মতো সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে। এমনকি গ্রামীণ এলাকাতেও জমি বা নির্মাণকাজ ঘিরে চাঁদাবাজির ঘটনা প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজ চক্রের নিয়ন্ত্রণ বদলেছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। নতুন করে সংগঠিত এসব চক্র পরিবহন টার্মিনাল, মহাসড়ক, লঞ্চঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রভাব বিস্তার করছে। টোল বা চাঁদার নামে অর্থ আদায়ের নানা পদ্ধতি চালু হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেখানেই অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে মামলা না হওয়ায় বা প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতির ওপরও বড় প্রভাব ফেলে। ব্যবসার খরচ বেড়ে যায়, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামও বাড়তে পারে। ফলে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে সমন্বিত উদ্যোগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, চাঁদাবাজদের পরিচয় ও কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য থাকা সত্ত্বেও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। এই অবস্থায় দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে জনআস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

