ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের চাহিদা নিয়ে অস্বাভাবিক চিত্র দেখা দিয়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে যেখানে এ উপজেলায় বইয়ের চাহিদা ছিল দুই লাখ ৬৭ হাজার, সেখানে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য একই উপজেলা থেকে পাঠানো হয়েছে সাত লাখ ৪৪ হাজারের বেশি বইয়ের চাহিদা। এতে গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৭৯ শতাংশ বৃদ্ধি দেখা গেছে, যা সংশ্লিষ্টদের কাছে অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শুধু পরশুরাম নয়, ফেনী সদর উপজেলাতেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। সেখানে আগের বছরের তুলনায় এবার ৪১ শতাংশ বেশি পাঠ্যবইয়ের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। তবে এমন চিত্র শুধু ফেনীর দুই উপজেলাতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অধিকাংশ উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকেও আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য একই ধরনের ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘ভূতুড়ে’ বইয়ের চাহিদা পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কিছু অসাধু ছাপাখানা মালিক, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং কিছু শিক্ষকের সমন্বয়ে একটি চক্র প্রতি বছর অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা তৈরি করে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কিছু কর্মকর্তাও এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। তাদের কারণে সারা দেশে গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত বা ভূতুড়ে চাহিদা দেখানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এতে সরকারের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপাতে বছরে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভূতুড়ে চাহিদার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ নিয়ে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট জেলা ও উপজেলা নির্বাচন করে পাঠ্যবইয়ের চাহিদার সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
ভূতুড়ে চাহিদার নতুন ঢেউ, নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত:
পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরণ ব্যবস্থাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি চক্র অতিরিক্ত বা ‘ভূতুড়ে’ চাহিদা তৈরির প্রথা চালু করে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে এ ধরনের অনিয়ম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আবারও রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই চক্র সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পর ছাপাখানা মালিকদের একটি অংশ রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে আবারও আগের মতো কার্যক্রম শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এবারও একই ধরনের প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা তৈরি করা হচ্ছে।
এদিকে ‘আরও পড়ুন’ শিরোনামে উঠে এসেছে—সময়মতো পাঠ্যবই দিতে আবারও ব্যর্থতা, সেই একই ‘অজুহাত’ এবং তদন্ত করতে ১১৭ ছাপাখানা মালিককে তলব, প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন, পাশাপাশি বই ছাপার জামানতের অর্থছাড়েও এনসিটিবিতে ‘বকশিশ বাণিজ্য’—এসব বিষয় নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানায়, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের চাহিদা সংগ্রহ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। অন্যদিকে মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ি স্তরের বইয়ের চাহিদা সরাসরি জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা এনসিটিবিতে পাঠান।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই অসাধু ছাপাখানা মালিক, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং কিছু শিক্ষকের একটি অংশ সমন্বিতভাবে অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা তৈরি করে আসছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তাও এ চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তাদের কারণে দেশে গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত চাহিদা দেখানো হয়, যার ফলে সরকার প্রতি বছর বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপাতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে।
এনসিটিবি সূত্র বলছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তর (ইবতেদায়িসহ) মোট পাঠ্যবইয়ের চাহিদা ছিল ২১ কোটি ৪৩ লাখ ২৪ হাজার ২৭৪ কপি। কিন্তু ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে এই চাহিদা হঠাৎ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়, যা কর্তৃপক্ষের কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। বিশেষ করে ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় ১৭৯ শতাংশ এবং ফেনী সদর উপজেলায় ৪১ শতাংশ বেশি বইয়ের চাহিদা পাঠানো হয়। বিষয়টি পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানায় এনসিটিবি। এরপর মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়।
অভিযোগের বিষয়ে ফেনীর পরশুরাম উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, তিনি অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন এবং চাহিদা তৈরির সময় একটি ভুল হয়েছে। তার ভাষায়, “আমাদের অফিস সহকারী চাহিদা লেখার সময় ভুল করে ১ হাজার ৮০০–এর জায়গায় ১৮ হাজার লিখে ফেলেছিলেন।”
একই কারণে ১৭৯ শতাংশ অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হওয়া কীভাবে সম্ভব—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “না না, এমন ভুল আরও কয়েক জায়গায় হয়েছে। পরে আমি নিজে দেখে সংশোধন করেছি।” সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগও তিনি নাকচ করে দিয়ে বলেন, “তিনি কোনো চক্রের সঙ্গে জড়িত নন, শুধু ভুল হয়েছে।”
এ বিষয়ে এনসিটিবির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছাপাখানা মালিকরা রাজনৈতিক প্রভাব হারিয়ে চাপে ছিলেন। কিন্তু নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তার দাবি, এবার সরকারদলীয় কিছু প্রভাবশালী মহলকে ব্যবহার করে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরণ ঘিরে অনিয়মের পরিকল্পনা চলছে। তিনি আরও বলেন, নোয়াখালীর একটি প্রেস ইতিমধ্যে রাজনৈতিক পর্যায়ে তদবির শুরু করেছে। তার মতে, ভূতুড়ে চাহিদা সেই পরিকল্পনারই প্রথম ধাপ।
কীভাবে তৈরি হয় অতিরিক্ত পাঠ্যবই চাহিদার তালিকা:
বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজের শুরুতেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সারাদেশ থেকে বইয়ের চাহিদা সংগ্রহ করা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। প্রাথমিক স্তরের চাহিদা সংগ্রহ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এনসিটিবিতে পাঠায়। আর মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ি স্তরের ক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)–এর সহযোগিতায় সরাসরি এনসিটিবি এই চাহিদা গ্রহণ করে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা যায়, উপজেলা পর্যায়ে প্রথমে শিক্ষা কর্মকর্তারা নিজ নিজ এলাকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও প্রয়োজনীয় পাঠ্যবইয়ের তালিকা সংগ্রহ করেন। এরপর প্রতিষ্ঠান প্রধানরা নিজেদের শিক্ষার্থী সংখ্যা দেখিয়ে বইয়ের চাহিদা পাঠান। অভিযোগ রয়েছে, এই পর্যায়েই অনেক সময় বাড়তি শিক্ষার্থী দেখিয়ে অতিরিক্ত চাহিদা যুক্ত করা হয়।
এরপর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সেই চাহিদা যাচাইয়ের নামে আরও বাড়িয়ে পাঠান। অনেক ক্ষেত্রে জেলা শিক্ষা অফিস থেকেও এক দফা পর্যালোচনার নামে চাহিদা আরও বাড়ানো হয়। পুরো প্রক্রিয়াটিই কিছু ছাপাখানা মালিকের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
একটি উদাহরণ টেনে এক শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, কোনো উপজেলায় যদি বাস্তবে ৫ লাখ বই প্রয়োজন হয়, আর আরেক উপজেলায় ৩ লাখ, তাহলে বাস্তব চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি দেখানো হয়। যেমন একটি উপজেলায় ৫ লাখের পরিবর্তে ৮ লাখ বইয়ের চাহিদা পাঠানো হতে পারে। এরপর অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয় ছাপাখানাগুলোকে আশপাশের একাধিক উপজেলার বই সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই প্রেস যদি একাধিক উপজেলার দায়িত্ব পায়, তাহলে এক জায়গার অতিরিক্ত চাহিদা দেখিয়ে কম বই ছাপিয়েও বেশি বিল তোলা সম্ভব হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নোয়াখালীর একটি উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ছাপাখানার কিছু প্রতিনিধি ফেব্রুয়ারি–মার্চ থেকেই শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তাদের অনুরোধ থাকে অন্তত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত চাহিদা বাড়িয়ে দেওয়ার। এই অতিরিক্ত অংশ থেকে কমিশন বা সুবিধা ভাগাভাগির বিষয়ও থাকে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, বাস্তবে বই প্রয়োজন হয় কম, কিন্তু কাগজে-কলমে চাহিদা বাড়িয়ে দেখানো হয়। পরে একই ছাপাখানা একাধিক উপজেলার দায়িত্ব পেলে কম বই ছাপিয়েই বেশি চাহিদার নামে বিল তোলা সম্ভব হয়।
২০২৬ শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরণ কার্যক্রমে এনসিটিবির উৎপাদন নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক আবু নাসের টুকু। বর্তমানে তিনি সংস্থাটির পাঠ্যপুস্তক বিভাগের সদস্য। অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অসাধু কিছু ছাপাখানা মালিক বিভিন্ন অজুহাতে বই ছাপার কাজ বিলম্বিত করে। শিক্ষাবর্ষ ঘনিয়ে এলে এনসিটিবি তখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। সেই সুযোগে অতিরিক্ত চাহিদা দেখানো উপজেলাগুলোতে বই বিতরণ করে বিল উত্তোলনের সুযোগ নেয় কিছু পক্ষ। তিনি আরও বলেন, এসব প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের ছাড়পত্রও কখনো কখনো দেওয়া হয়ে থাকে। তবে এবার এমন অনিয়ম রোধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে এবং কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এনসিটিবির মাঠ পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে জনবল ঘাটতির প্রভাব:
এবার পাঠ্যবইয়ের চাহিদা নিয়ে ‘ভূতুড়ে’ অস্বাভাবিকতা সামনে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। গত ৯ এপ্রিল এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠায় সংস্থাটি।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে সারাদেশ থেকে পাঠ্যবইয়ের চাহিদা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে জেলা, উপজেলা ও থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে পাঠানো চাহিদার সঠিকতা যাচাই করতে দৈবচয়ন ভিত্তিতে একটি উপজেলায় সরেজমিন পরিদর্শন করে এনসিটিবির কর্মকর্তারা। সেখানে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য পাঠানো চাহিদা ও প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনা করে দেখা যায়, বাস্তব চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি বইয়ের অনুরোধ পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনার পর বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রীর নজরে এলে তিনি বিশেষ নির্দেশনা দেন। নির্দেশনার পর মাঠপর্যায়ে নেমেছে এনসিটিবির বিভিন্ন টিম। জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে পাঠানো চাহিদার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখার কাজ চলছে।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান তুলে ধরে বলেন, “বিগত সরকারের সময়ে বই ছাপার নামে অনেক ছাপাখানা মালিক অসাধু উপায়ে লাভবান হয়েছেন। কেউ কেউ এক লাখ বই ছেপে পাঁচ লাখের বিল তুলেছেন। এটি সরাসরি জনগণের ট্যাক্সের টাকা লুটপাট। এটা কোনোভাবেই হালাল ব্যবসা নয়। এসব অনিয়মে আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
এদিকে ১৫ ও ১৬ এপ্রিল দেশের বিভিন্ন জেলায় অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা যাচাইয়ে এনসিটিবির মনিটরিং টিম কাজ শুরু করে। তবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একজন কর্মকর্তাকে একাধিক জেলার দায়িত্ব দেওয়ায় এবং সময় স্বল্পতার কারণে সব জায়গায় যথাযথভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক জায়গায় কাগজে-কলমে চাহিদা ও বাস্তবতার ব্যবধান পুরোপুরি ধরা পড়েনি।
ঢাকার পাশের দুটি জেলায় মাঠপর্যায়ে কাজ করা একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একটি জেলায় ৭ থেকে ৮টি উপজেলা থাকে। দুই দিনে ১২ থেকে ১৪টি উপজেলায় গিয়ে যাচাই করা প্রায় অসম্ভব। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কাজ দ্রুত শেষ করতে হচ্ছে। এতে প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি উঠে আসছে না। আরও জনবল ও সময় থাকলে কাজটি ভালোভাবে করা যেত।”
অন্যদিকে এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, এবার জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে পাঠানো বইয়ের চাহিদা আগের তুলনায় অনেক বেশি এবং তা অস্বাভাবিক বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সারাদেশে ৩০টি টিম মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাদের প্রত্যাশা, যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ভুয়া বা অতিরিক্ত চাহিদা শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বই ছাপিয়ে আর কোটিপতি হওয়া যাবে না, ছাড় নেই: শিক্ষামন্ত্রী
পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অসাধু চক্র ভেঙে দেওয়া হবে বলে কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে বই ছাপার কাজকে ঘিরে অনেক ছাপাখানা মালিক অস্বাভাবিকভাবে লাভবান হয়েছেন। তার ভাষায়, “কেউ কেউ এক লাখ বই ছেপে পাঁচ লাখ বইয়ের বিল তুলেছেন। এতে লুটপাট হয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা এভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “এটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ব্যবসা নয়। এটা অনিয়ম। এ ধরনের কাজে আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
শিক্ষামন্ত্রী পাঠ্যবইয়ের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, শুধু বই ছাপা নয়, এর মান, কাগজ, মুদ্রণ এবং বিষয়বস্তুও উন্নত হতে হবে। তার মতে, বর্তমান শিক্ষাক্রমকে আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী করার কাজ চলছে। তিনি জানান, কারিকুলাম পর্যালোচনার অংশ হিসেবে ক্রীড়া শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাকে আরও আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। এজন্য পাঠ্যবইয়ের কনটেন্টও নতুনভাবে সাজানো হবে।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, “প্রেস মালিকদের সতর্ক হতে হবে। একই সঙ্গে যারা পাঠ্যবইয়ের কনটেন্ট তৈরি করেন, তাদেরও আরও সৃজনশীল চিন্তা করতে হবে। নিম্নমানের বা পুরনো ধাঁচের কনটেন্ট দিয়ে বই তৈরি করা যাবে না। একইভাবে মানহীন কাগজ ও মুদ্রণ ব্যবহার করেও অর্থ নেওয়ার সুযোগ নেই।” তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

