ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা যত বাড়ছে, ততই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার হামলার ঝুঁকি। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো এখন ক্রমেই বেশি করে হ্যাকারদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, আগের তুলনায় অনেক দ্রুতগতিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারছে সাইবার অপরাধীরা। এতে বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। তথ্যটি জানিয়েছে দ্য ন্যাশনাল নিউজ।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক আইটি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান কোয়ালিস তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলেছে, সাইবার হামলার ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সামনে তৈরি হচ্ছে নতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জ। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, ডিজিটাল সিস্টেম যত বেশি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, ঝুঁকিও তত বাড়ছে।
ডিজিটাল অবকাঠামো বলতে মূলত সেই প্রযুক্তিগত ভিত্তিকে বোঝায়, যার ওপর আধুনিক ইন্টারনেটনির্ভর সেবা দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক, ফাইবার অপটিক কেবল, ডেটা সেন্টার, সার্ভার, ক্লাউড সিস্টেম, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ব্যাংকিং ও সরকারি সেবার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম।
‘দ্য ব্রোকেন ফিজিকস অব রেমেডিয়েশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রচলিত সাইবার নিরাপত্তা পদ্ধতি আর যথেষ্ট কার্যকর নয়। হামলার পরিমাণ ও কৌশল যেভাবে বদলাচ্ছে, তাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও দ্রুত উন্নত করতে হবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অটোমেশন ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান অরেঞ্জ সাইবারডিফেন্স জানায়, ডিজিটাল নির্ভরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সাইবার অপরাধও বেড়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে পরবর্তী এক বছরে বিশ্বব্যাপী ১ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি সাইবার নিরাপত্তা বিঘ্নের ঘটনা ঘটেছে।
এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে অননুমোদিত প্রবেশ, ম্যালওয়্যার ও র্যানসমওয়্যার আক্রমণ এবং ডেটা চুরি বা ফাঁস।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, নতুন প্রযুক্তির বিস্তার, লক্ষ্যবস্তুর পরিবর্তন এবং জেনারেটিভ এআইভিত্তিক হুমকির উত্থান সাইবার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে গত বছরের সেপ্টেম্বরে র্যানসমওয়্যার হামলায় বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়। ওই সময় বিশ্বজুড়ে ৫৬২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি।
বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। ২০২৫ সালে সাইবার অপরাধের কারণে বৈশ্বিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
কোয়ালিসের প্রধান নির্বাহী সুমেধ ঠাকুর বলেন, এআই ও অটোমেশনের ব্যবহার মানে মানবসম্পৃক্ততা কমে যাওয়া নয়। বরং এতে মানুষ আরও কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দিতে পারবে, যা সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে।
এদিকে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০২৬ সালের গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগামী এক দশকে প্রযুক্তিগত ঝুঁকি আরও তীব্র হতে পারে। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি শীর্ষ ১০ ঝুঁকির তালিকায় সাইবার অপরাধ বড় হুমকি হিসেবে উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল অবকাঠামো সুরক্ষায় শুধু প্রচলিত পদ্ধতি যথেষ্ট নয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তি ও কৌশলে মৌলিক পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি।

