ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালকে ঘিরে রাজধানীতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক দালাল চক্র। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনদের লক্ষ্য করে এই চক্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে। হাসপাতালের শয্যা সংকট, আইসিইউ ও এনআইসিইউ সেবার চাপকে কাজে লাগিয়ে তারা রোগীদের বিভ্রান্ত করে পাঠিয়ে দিচ্ছে ঢাকার বিভিন্ন নামসর্বস্ব বেসরকারি হাসপাতালে।
হাসপাতাল সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঢামেক কেন্দ্রিক অন্তত ৮ থেকে ১০টি শক্তিশালী দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন ও অসহায় পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তারা রোগীদের সরকারি হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নিচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসার নামে অতিরিক্ত খরচের চাপ তৈরি হয়।
প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগী ও স্বজনরা অনেক সময় না বুঝেই এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন। পরে দেখা যাচ্ছে, চিকিৎসা ব্যয়ের অস্বাভাবিক চাপের কারণে বহু পরিবার আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল অর্থ ব্যয় করেও অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত চিকিৎসা সেবা মিলছে না।
অন্যদিকে, এই দালালচক্রের তৎপরতায় সাধারণ মানুষ বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় গ্রেপ্তারের পর কিছুদিনের মধ্যেই তারা জামিনে বের হয়ে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
ফলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এক গ্রুপের সদস্য গ্রেপ্তার হলেও শূন্যস্থান পূরণ করছে নতুন চক্র। বর্তমানে ঢামেক ও আশপাশ এলাকায় সক্রিয় এসব চক্র নিয়মিতভাবে রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ‘পথ দেখানোর’ নামে অর্থের বিনিময়ে সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শ্যামলীর ক্লিনিকে শিশুর মৃত্যু, জালিয়াতির অভিযোগ ঘিরে তোলপাড়
রাজধানীর শ্যামলীর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে অক্সিজেন গ্যাস লিকেজের ঘটনায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে হাসপাতালটির কার্যক্রম, বেড ব্যবস্থাপনা ও রোগী ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ।
খাতা-কলমে ২০ শয্যার প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে সেখানে সাধারণ বেডের অস্তিত্ব নেই বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে মূলত এনআইসিইউ ও পিআইসিইউ মিলিয়ে ১০টি বেড চালু রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব বেডকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে পুরো চিকিৎসা বাণিজ্য।
অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে দালালদের মাধ্যমে অনেক রোগী এই ক্লিনিকে আনা হয়। ভর্তি হওয়া রোগীদের বড় একটি অংশই সরকারি হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত এখানে পৌঁছান।
এক ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, গত ২১ জুন ঢামেক হাসপাতালে সিজারের মাধ্যমে মুক্তা বেগমের পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। জন্মের পরপরই শিশুটির শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে চিকিৎসকেরা দ্রুত এনআইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ সময় হাসপাতালের ওয়ার্ডে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি জানান, ঢামেকে কোনো এনআইসিইউ বেড খালি নেই। পরে তারা একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়ার পরামর্শ দেন এবং প্রতিদিন আট হাজার টাকা খরচ হবে বলে আশ্বাস দেন।
পরবর্তীতে শিশুটিকে শ্যামলীর ‘বেবি কেয়ার হাসপাতালে’ নেওয়া হয় বলে পরিবার দাবি করে। শিশুটির ননদ আসমা খাতুন বলেন, “আমাদের বলা হয়েছিল প্রতিদিন আট হাজার টাকার মতো খরচ হবে। কিন্তু তিন দিনেই প্রায় ৫০ হাজার টাকা বিল করা হয়েছে। ২৩ জুন সন্ধ্যায় হঠাৎ বিকট শব্দ হয়, দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তখন একটি শিশু মারা যায়। পরে আমাদের শিশুসহ অন্যদের পাশের আরেকটি হাসপাতালে পাঠানো হয়। আমরা সন্তানকে নিয়ে যেতে চাইলে প্রথমে বাধা দেওয়া হয়।”
স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, দালালদের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী এনে এক বা দুটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে কিছু বেড বসিয়ে গড়ে তোলা এসব ক্লিনিকে চিকিৎসার নামে বিপুল অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী চিকিৎসক না থাকলেও মাঝেমধ্যে শেয়ারধারী চিকিৎসকেরা এসে রোগী দেখেন বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শ্যামলীর ওই ভবনের সপ্তম তলায় পাশাপাশি দুটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কার্যক্রম চলছে—একটি ‘বেবি কেয়ার’ এবং অন্যটি ‘হাই কেয়ার জেনারেল হাসপাতাল’। বেবি কেয়ারে সাধারণ বেড নেই। দুটি কক্ষে এনআইসিইউ ও পিআইসিইউ মিলিয়ে ১০টি বেড রয়েছে। পাশে বড় বড় অক্সিজেন সিলিন্ডারও রাখা আছে। পুরো ভবনে একাধিক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালু থাকায় এটি একটি চিকিৎসা ভবন না বাণিজ্যিক ভবন—তা বোঝা কঠিন।
এর আগেও একই ভবনের চতুর্থ তলায় থাকা ‘ডক্টরস কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে অস্ত্রোপচারের অভিযোগে সিলগালা করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবি কেয়ার হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট কোনো সাধারণ রোগী আসে না। সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালদের মাধ্যমে রোগী আনা হয়। স্থায়ী চিকিৎসকও সীমিত। শেয়ারধারী চিকিৎসকেরা মাঝে মাঝে এসে রোগী দেখেন। তিনি আরও দাবি করেন, এই ভবনের অন্যান্য হাসপাতালেও একইভাবে দালালচক্রের মাধ্যমে রোগী আনা হয়। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। রিসিপশন থেকে জানানো হয়, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকেই তথ্য নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী পাঠাতে পারলে দালালচক্র প্রতি রোগীতে ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন পায়। এই অর্থ ট্রলিম্যান, আয়া, ওয়ার্ডবয়, দালাল ও অ্যাম্বুলেন্স চালকদের মধ্যে ভাগ হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ, শয্যা সংকট এবং আইসিইউ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়েই গড়ে উঠেছে এই বহুমাত্রিক দালাল ও চিকিৎসা বাণিজ্যের চক্র।
ঢাকা মেডিকেল ঘিরে বিভ্রান্তি, রোগী জিম্মির অভিযোগ
রাজধানীর নদ্দা এলাকায় কোরবানির ঈদের আগের দিন সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন বুলবুল আহমেদ। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। তবে হাসপাতাল প্রাঙ্গণেই ঘটে যায় একটি বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি, যা শেষ পর্যন্ত রোগী স্থানান্তর ও আর্থিক চাপের অভিযোগে গড়ায়।
ভর্তির কিছুক্ষণ পরই বুলবুলের বাবা হাসমত আলীর কাছে তিনজন ব্যক্তি এসে উপস্থিত হন। তারা তাকে জানায়, ঢামেকে পর্যাপ্ত সিট ও চিকিৎসক নেই, এখানে থাকলে রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। প্রথমবার ঢাকায় এসে অসহায় অবস্থায় থাকা হাসমত আলী তাদের কথায় প্রভাবিত হয়ে পড়েন।
পরে ওই ব্যক্তিরাই অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে রোগীকে কাটাবনের ‘হোম কেয়ার হাসপাতাল’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, রোগী সেখানে ভর্তি করার পর তারা দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়।
হাসমত আলী বলেন, “আমি ঢাকার কিছুই চিনি না। ছেলের জীবনের কথা ভেবে ওদের কথায় রাজি হই। কিন্তু এখানে আনার পরই বলা হয় আইসিইউ লাগবে, প্রতিদিন খরচ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।” তিনি আরও জানান, মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে আইসিইউ বাবদ বিল দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা। “অনেক কষ্টে ৭০ হাজার টাকা দিতে পেরেছি। দুই দিন ধরে বলছি ছেলেকে আইসিইউ থেকে সাধারণ বেডে দিতে। কিন্তু পুরো টাকা পরিশোধ না করলে তারা বেডে নিচ্ছে না,”—অভিযোগ করেন তিনি।
হাসমত আলীর দাবি, ঢামেক থেকে এমনভাবে অনেক রোগীকেই বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে আর্থিকভাবে চাপের মধ্যে ফেলা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখানো হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে আবারও প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি হাসপাতালের জরুরি সেবার সংকট ও দালালচক্রের সক্রিয়তা কি সাধারণ রোগীদের জন্য নতুন এক জিম্মিদশা তৈরি করছে কি না।
ঢামেকের ভেতর দালাল সিন্ডিকেট, রোগীপ্রতি ভাগ হচ্ছে কমিশন
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালকে ঘিরে সক্রিয় দালাল চক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। হাসপাতালের অভ্যন্তরের নির্দিষ্ট কিছু ওয়ার্ড এবং আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক সিন্ডিকেট, যারা রোগী ‘সরবরাহ’কে ব্যবসায় পরিণত করেছে বলে অভিযোগ।
বিশেষ করে হাসপাতালের ২১২ নম্বর গাইনি ওয়ার্ড এবং ২১১ নম্বর এনআইসিইউ ওয়ার্ডকে এই চক্রের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগী ও স্বজনদের অসহায়ত্ব এবং ঢাকার চিকিৎসা ব্যবস্থার অচেনা পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে তাদের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানো হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢামেকের শয্যা সংকট, আইসিইউ ও এনআইসিইউ সেবার সীমাবদ্ধতাকে কেন্দ্র করেই এই দালালচক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। রোগী একবার সরকারি হাসপাতাল থেকে বের হলে তাকে নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে এই সিন্ডিকেট।
একটি ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুর পরও বড় অঙ্কের বিল ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং তা পরিশোধ না করা পর্যন্ত লাশ হস্তান্তর না করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। নিহতের ভাই জবেদ বলেন, “মারা যাওয়ার পর আমাদের কাছে বড় অঙ্কের বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। এত অল্প সময়ে এত টাকা পরিশোধ করা সম্ভব ছিল না। বিল নিয়ে প্রশ্ন করায় আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয় এবং বলা হয়, টাকা না দিলে লাশ দেওয়া হবে না। আমরা পুলিশ ও সাংবাদিকদের খবর দেওয়ার পর আমাকে একটি কক্ষে নিয়ে হাসপাতালের এক পরিচালক খারাপ আচরণ করেন।”
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ঢামেক থেকে নির্দিষ্ট বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী পাঠাতে পারলেই প্রতি রোগীতে ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন আদান-প্রদান হয়। এই টাকা কয়েক ধাপে ভাগ হয়। একটি অ্যাম্বুলেন্স চক্র পায় প্রায় দুই হাজার টাকা, দালাল পায় প্রায় দুই হাজার টাকা, ওয়ার্ডবয় বা আয়া ধরনের কর্মীরা পান প্রায় চার হাজার টাকা এবং ট্রলি থেকে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত রোগী বহনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা পান প্রায় ছয় হাজার টাকা।
এ কাজে যুক্তদের মধ্যে কেউ সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত, কেউ আবার দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যক্তি নিজেদের সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে রোগী ও স্বজনদের বিভ্রান্ত করেন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য করেন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা মেডিকেল থেকে রোগী সরিয়ে নেওয়ার কাজে একাধিক সংগঠিত গ্রুপ সক্রিয়। রাজধানীর রামপুরার মাল্টিকেয়ার হাসপাতাল, কাঁটাবনের হোম কেয়ার, চানখাঁরপুলের রয়েল কেয়ার অ্যান্ড সার্জিক্যাল, যাত্রাবাড়ীর প্যারামাউন্ট স্পেশালাইজড হাসপাতাল, শ্যামলীর সিটি কেয়ার ও হাই কেয়ার এবং পান্থপথের ইউনি হেলথ কেয়ারে রোগী সরবরাহের জন্য পৃথক চক্র কাজ করে বলে জানা গেছে। এই নেটওয়ার্কে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি যুক্ত থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ২১১ ও ২১২ নম্বর ওয়ার্ড এবং জরুরি বিভাগকে ঘিরে রোগী অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার একাধিক দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব চক্র হাসপাতালের অভ্যন্তরের কর্মী পরিচয় ব্যবহার করে রোগী ও স্বজনদের বিভ্রান্ত করছে বলে জানা যায়।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে বলা হচ্ছে, ২১১ নম্বর রুমের দায়িত্বে রয়েছেন মতিয়ার, শাওন, রাজীব, আব্দুর রব ও রুবেল। অন্যদিকে ২১২ নম্বর রুমের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে কাশেম, কালাম, সিয়াম ও শিপনের নাম উঠে এসেছে। জরুরি বিভাগ থেকে রোগী স্থানান্তরের কাজে সর্দার স্বপন ও মনছুরের নেতৃত্বে ডেইলি বেসিসে (দৈনিক হাজিরাভিত্তিক) কর্মরত শহীদ, দুলাল, সালাউদ্দিন, বিল্লাল ও বাপ্পী কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া রোগীকে ওয়ার্ড থেকে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় ট্রলিম্যানদের একটি অংশ যুক্ত থাকে বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে নেওয়াজ, মিঠু, বাধন, ইব্রাহিম, রফিক, সেন্টু, মালেক, রহমান, সজীব, আওলাদ, আকাশ, নবীন, ইয়াসীন, রুবেল, জুয়েল, সোহেল, আজিজ, রানা, সাগর, তমাল, সেফালী, মাহাদী, রবিন, তুষার, আনোয়ার, হাসেম, রিয়াজ, সিয়াম, সোহাগ ও মিঠুনসহ অনেকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই চক্রগুলো দালালদের সঙ্গে সমন্বয় করে রোগীকে সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার কাজে সরাসরি সহযোগিতা করে। অনেক সময় তারা নিজেদের হাসপাতালের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে রোগী ও স্বজনদের আস্থা অর্জন করেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, দালালদের প্রতিরোধে সার্বক্ষণিক তদারকির নির্দেশনা রয়েছে। তিনি বলেন, “দালাল ধরা ডাক্তারদের কাজ নয়। এর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেও কেউ কেউ এ চক্রে জড়িত থাকতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, দালাল দমনে আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের নিয়োজিত করা হয়েছে। তবে তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সরাসরি রিপোর্ট দিতে বাধ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, রোগীর অতিরিক্ত চাপ, আইসিইউ সংকট এবং শয্যা ঘাটতিকে কেন্দ্র করেই এই দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে উঠছে। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে পুলিশে দেওয়া হলেও তারা আবার জামিনে বের হয়ে একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, রোগীদের একাংশকে এমন বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে নেওয়া হয় যেখানে ভবনের এক বা দুই ফ্লোর ভাড়া নিয়ে সীমিত আকারে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণ বেড না রেখে মূলত আইসিইউ, এনআইসিইউ ও পিআইসিইউ বেডের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, সম্প্রতি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে দুর্ঘটনায় আহত ২২ বছর বয়সী মারুফকে ঘিরে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। মারুফের বন্ধু বিকাশ জানান, দুর্ঘটনার পর তারা মারুফকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, চিকিৎসকেরা সিটি স্ক্যানের পরামর্শ দেন এবং আইসিইউ প্রয়োজন হতে পারে বলেও জানান। এ সময় তিনজন ব্যক্তি নিজেদের হাসপাতালের কর্মী পরিচয় দিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
বিকাশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিরা জানান ঢামেকে আইসিইউ খালি নেই এবং তাদের পরিচিত একটি বেসরকারি হাসপাতালে বেড রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হবে। রোগীর অবস্থা বিবেচনায় তারা তাদের কথায় রাজি হন এবং পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে ওই হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে হাসপাতালে ভর্তি করার সময় পুরো টাকা পরিশোধ না করতে পারায় স্বজনদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আমাদের একমাত্র চিন্তা ছিল রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা। ভর্তি করার পরপরই তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। বিকেলের দিকে পপুলারে নিয়ে সিটি স্ক্যান করানো হয়। রিপোর্টে দেখা যায়, মাথায় রক্ত জমাট বেঁধেছে এবং দ্রুত অস্ত্রোপচার করতে হবে।” তিনি জানান, পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অস্ত্রোপচারের জন্য প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ নির্ধারণ করে। “আমরা ঢাকার কিছুই চিনি না, তাই বাধ্য হয়ে রাজি হই। রাত ৮টার দিকে অপারেশন হয়। কিন্তু পরদিন সকালে মারুফের মৃত্যু হয়,” বলেন বিকাশ।
পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রায় চার লাখ টাকার বিল ধরিয়ে দেয়। অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় প্রায় আট ঘণ্টা লাশ আটকে রাখা হয় বলেও দাবি করা হয়। পরে পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত হলে দুই লাখ টাকা পরিশোধের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. এম এ মুহিত বলেন, সমস্যাটি একদিনে সমাধান সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “একদিকে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে রোগীর চাপও কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। স্থায়ী সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সব পক্ষের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।”
অন্যদিকে নিহতের ভাই জবেদ অভিযোগ করেন, মৃত্যুর পর তাদের বড় অঙ্কের বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। “এত অল্প সময়ে এত টাকা পরিশোধ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। বিল নিয়ে প্রশ্ন করায় খারাপ আচরণ করা হয় এবং বলা হয়, টাকা না দিলে লাশ দেওয়া হবে না,” তিনি বলেন। তিনি আরও দাবি করেন, “আমরা তো ইচ্ছা করে এই হাসপাতালে আসিনি। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা হবে না—এই কথা বলেই তাকে এখানে আনা হয়েছিল।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হাসপাতালের ওপর রোগীর অতিরিক্ত চাপ এবং আইসিইউ সংকটের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তিনি জানান, প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০টি সিজার হয় এবং নবজাতকদের একটি বড় অংশেরই আইসিইউ প্রয়োজন হয়।
তিনি আরও বলেন, নিউরোসায়েন্স বিভাগে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী থাকে, ফলে সেবা দিতে গিয়ে চাপ তৈরি হয়। “আইসিইউ বেড খালি হওয়া সাপেক্ষে প্রতিদিন মাত্র কয়েকজনকে দেওয়া সম্ভব হয়। তখন রোগীর স্বজনদের অন্যত্র খোঁজ নিতে বলা হয়, আর সেখানেই তারা দালালদের খপ্পরে পড়ে,” বলেন তিনি।
দালাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দালাল প্রতিরোধে নির্দেশনা দেওয়া আছে এবং বিভিন্ন সংস্থা দায়িত্ব পালন করছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, দালাল চক্র পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর মতে, রোগীর অতিরিক্ত চাপ ও আইসিইউ সংকটকে কেন্দ্র করেই এই চক্র সক্রিয় থাকে এবং অভিযানের পরও তারা আবার ফিরে আসে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আমাদের কাছে এ বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ দেয় না। যদি সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করা হতো, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হতো। তারপরও দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা একাধিকবার অভিযান চালিয়েছি এবং কয়েকজনকে আটক করে শাস্তির আওতায় এনেছি। প্রয়োজনে আবারও অভিযান চালানো হবে। এ ক্ষেত্রে আপনাদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।”
এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের প্রায় সব সরকারি হাসপাতালেই একই ধরনের সংকট রয়েছে। তিনি বলেন, “হাসপাতালগুলোতে নির্ধারিত শয্যার তুলনায় দ্বিগুণ, এমনকি তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকেন। অনেক রোগীকে বারান্দা ও মেঝেতে পর্যন্ত থাকতে হয়। কোথাও ৫০০ শয্যার হাসপাতালে ১২০০ থেকে ১৫০০ রোগী থাকেন, আবার ১৫০০ শয্যার হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা প্রায় চার হাজারে পৌঁছে যায়।” তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা অত্যন্ত বেশি হলেও তার তুলনায় সেবার সক্ষমতা ও অবকাঠামো সীমিত। এই ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে দালাল চক্র ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সক্রিয় হয়ে ওঠে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক মানুষই সচেতনতা, শিক্ষা, সামাজিক ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সহজেই বিভ্রান্ত হন। এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে শহরের দালালরা রোগী ও স্বজনদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলে।”
সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি একদিনে সমাধান সম্ভব নয়। “একদিকে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা ও সরবরাহ বাড়াতে হবে, অন্যদিকে রোগীর চাপ ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন,”—বলেন তিনি।
সূত্র: ঢাকা পোস্ট

