একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ত্রিপুরায় সীমান্তের ওপারে গড়ে ওঠে একটি মানবিক চিকিৎসাকেন্দ্র—বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের চিকিৎসায় নিবেদিত সেই উদ্যোগই পরবর্তীতে জন্ম দেয় স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ স্বাস্থ্যভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। মুক্তিযুদ্ধের সহযাত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির নাম আজও দেশ-বিদেশে পরিচিত।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান কার্যালয় সাভারের মির্জানগরে অবস্থিত। দেশের বিভিন্ন স্থানে এর ৪৩টি উপকেন্দ্র রয়েছে। গণবিশ্ববিদ্যালয়, ফার্মাসিউটিক্যালস, নারী উন্নয়ন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি এবং সামাজিক উন্নয়নসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এটি স্বাধীনতা পুরস্কারও অর্জন করেছে। তবে এত বড় ও ঐতিহাসিক একটি প্রতিষ্ঠানও মব সন্ত্রাসের অভিযোগ থেকে বাদ যায়নি বলে দাবি উঠেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তনের পর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখল হয়ে যায়—এমন অভিযোগ সামনে আসে। একই সঙ্গে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
এই বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি ঘিরে দখলের চেষ্টা শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সদর দপ্তরে অর্ধশতাধিক ব্যক্তির উপস্থিতিতে একটি মব পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে দাবি করা হয়। ওই ঘটনায় প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি মুক্তিযোদ্ধা ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ এবং পরিচালক ডা. মাহবুব জুবায়েরকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘটনা প্রসঙ্গে ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি তখন কোনো পদে দায়িত্বে ছিলেন না। তবে তাকে সরাতে পারলেই পুরো প্রতিষ্ঠান দখল সহজ হবে—এমন উদ্দেশ্য থেকেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও শিরিন হক দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার দিন মির্জানগরে বহিরাগতদের আনা হয় এবং ফোনে নির্দেশ দিয়ে তাকে পদত্যাগ করানো ও স্থান ত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মচারীর বিরুদ্ধেও ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। ডা. নাজিমউদ্দিন আহমাদের দাবি, ঘটনাস্থলে স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও “ওপর মহলের নির্দেশনা” থাকার কথা জানিয়ে তারা কোনো হস্তক্ষেপ করেননি।
রিজওয়ানার নির্দেশ—ডা. নাজিমকে বের করা হয়:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান—এমন দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলের একটি সুযোগ তৈরি হয়। ওই সময় সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প দিনের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয় বলেও দাবি করা হয়েছে। এরপর পরিকল্পিতভাবে ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়—এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
ঘটনার সময় মবের চাপে ডা. নাজিমউদ্দিনের একটি কথিত পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষরের ছবি কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে। সেখানে লেখা ছিল, তিনি স্বেচ্ছায় সব দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের কোনো কার্যক্রমে থাকবেন না। ঘটনার সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, ওই পদত্যাগপত্রের ভাষা উপস্থিত ব্যক্তিরাই লিখে দেন এবং চাপের মুখে তাকে সই করতে বাধ্য করা হয়।
অন্যদিকে ডা. নাজিমউদ্দিন অভিযোগ করেন, তাকে অপমান করে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ ছিল সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের। তাঁর দাবি অনুযায়ী, প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে তাকে পদত্যাগে রাজি হওয়ার অনুরোধ জানান এবং ফোনে লাউড স্পিকারে কথোপকথনের সময় “বের করে দেওয়া” বা “গ্রেপ্তার” করার মতো নির্দেশনার কথা শোনানো হয় বলেও তিনি দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক একজন পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলেও জানা যায়। তবে ওই পুলিশ কর্মকর্তা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে উল্লেখ করে সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার পরামর্শ দেন—এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ঘটনাস্থলের একাধিক ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, গণস্বাস্থ্য মেডিক্যাল কলেজের একটি কার্যালয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল প্রবেশ করে। তারা দীর্ঘ সময় ধরে ডা. নাজিমউদ্দিন ও ডা. মাহবুব জুবায়েরকে পদত্যাগে চাপ দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পুরো ঘটনাটি কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে বলে জানা যায়।
ভিডিও ফুটেজে কয়েকজনকে ঘটনাটির নেতৃত্বে থাকতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন চিকিৎসক ও প্রশাসনিক কর্মীর নামও উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ট্যাগ ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে। সেই প্রেক্ষাপটে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সূচনা ও সহযাত্রীরা:
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সাধারণভাবে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নামই বেশি আলোচিত। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই প্রতিষ্ঠানের সূচনালগ্নে আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন—যাদের ভূমিকা দীর্ঘদিন আড়ালেই থেকে গেছে। তেজগাঁওয়ের ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিস থেকে সংগৃহীত ১৯৭২ সালের ১৪ অক্টোবরের একটি সত্যায়িত দলিল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছিল সে সময়। দলিলটি নিবন্ধিত হয় ১৯৭২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর।
উক্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মোট ছয়জন। তাঁরা হলেন—ডা. এম এ মবিন, ডা. এ টি এম জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. মো. আলতাফুর রহমান, ডা. কাজী কামরুজ্জামান, ডা. বরকত আলী চৌধুরী এবং ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ। দলিল অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা পরে চারজনকে নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন। তাঁরা হলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ, সাদেক খান এবং এম জাকারিয়া। এদের মধ্যে ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ ছাড়া অন্যদের কেউ এখন আর জীবিত নেই।
প্রতিষ্ঠাতাদের অবস্থান নিয়েও জানা যায়, ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ এবং ডা. কাজী কামরুজ্জামান বর্তমানে দেশে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে ডা. এম এ মবিন ও ডা. আলতাফুর রহমান যুক্তরাজ্যে এবং ডা. বরকত আলী যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তথ্য অনুযায়ী, আশির দশকের পর তাঁদের অনেকেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না।
২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ ও নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এরপরই আলোচনায় উঠে আসেন আরেক প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ডা. নাজিমউদ্দিন প্রচারবিমুখ হলেও প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ও বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর নাম উল্লেখযোগ্যভাবে যুক্ত রয়েছে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রারম্ভিক যাত্রা ও কাঠামো বিশ্লেষণ করলে তাঁর ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—এমনটিই দাবি সংশ্লিষ্টদের।
নেপথ্যে থাকা বীরত্বের ইতিহাস:
মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল নিয়ে গবেষণা প্রবন্ধে উঠে এসেছে ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদের ভূমিকা ও তৎকালীন চিকিৎসা কার্যক্রমের নেপথ্যের ইতিহাস। শাহাদুজ্জামান ও খায়রুল ইসলামের যৌথ গবেষণা প্রবন্ধ “মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব এক হাসপাতাল”-এ বলা হয়েছে, এই হাসপাতালের পেছনে ছিলেন একদল নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক।
প্রবন্ধ অনুযায়ী, ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে শুরুতে যুক্ত ছিলেন সেনাবাহিনীর দুই সদস্য—ডা. আখতার আহমেদ ও ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম। পরে বিদেশ থেকে এসে যুক্ত হন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. এম এ মবিন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন দলিল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ আগরতলার ২ নম্বর সেক্টরে যুক্ত হয়ে প্রথমে বিবির বাজারের যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য সোনামুড়ায় একটি অস্থায়ী হাসপাতাল গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে শ্রীমন্তপুর থেকে সরে গিয়ে তিনি ডা. আখতার আহমেদের সঙ্গে যৌথভাবে হাসপাতাল পরিচালনা করেন। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও স্থান সংকটের কারণে হাসপাতালটি ধাপে ধাপে বন বিভাগের একটি টিনের ঘরে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে এর সাংগঠনিক কাঠামো আরও সুসংগঠিত হয় বলে উল্লেখ রয়েছে।
১৯৭১ সালের মে মাসে যুক্তরাজ্য থেকে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. এম এ মবিন যোগ দিলে হাসপাতালের কার্যক্রম ও পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত ডা. আখতার আহমেদ, ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ এবং ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম সরাসরি চিকিৎসা কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।
অন্যদিকে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মূলত আন্তর্জাতিক যোগাযোগ স্থাপন করে অর্থ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সহায়তা সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক সংযোগ নিয়ে ফ্রান্সের লেখক লুইসিয়েন বিগল্ট একটি বই লেখেন, যার শিরোনাম “সলিডারিটি অ্যাক্রস বর্ডারস”। বইটিতে ১৯৭৬ সালের একটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে বলেও জানা যায়।
গণপ্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ফ্রম ব্যাটল ফ্রন্ট টু কমিউনিটি : স্টোরি অব গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র বইয়েও ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদের নাম একাধিকবার উল্লেখ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ফিল্ড হাসপাতালে তাঁর ভূমিকা সেখানে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। বইটিতে ১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর কুমিল্লার মন্দাবাগ থেকে বিদেশি সাহায্যকারী বন্ধুদের উদ্দেশে লেখা একটি চিঠির কথাও উল্লেখ রয়েছে। ওই চিঠিতে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ডা. নাজিমউদ্দিনের অবদানের কথা উল্লেখ করেন বলে জানা যায়।
এদিকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে দখল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনুসন্ধানে দাবি করা হচ্ছে, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে ষড়যন্ত্র শুধু অনানুষ্ঠানিক চাপ বা মব পরিস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং একটি নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপও নেয়। গত বছরের ২৫ জানুয়ারি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নামে একটি নতুন ট্রাস্ট দলিল তৈরি করা হয় বলে জানা যায়। আশুলিয়া সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয় থেকে সংগৃহীত অনুলিপিতে দেখা যায়, সাতজনকে নিয়ে একটি নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
এই সাতজন হলেন—আলতাফুন্নেসা, আবুল কাশেম চৌধুরী, সন্ধ্যা রায়, মনজুর কাদির আহম্মেদ, শিরীন পারভীন হক, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং আব্দুল কাদের আজাদ। তবে ট্রাস্ট আইন ১৮৮২ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠাতাদের বাইরে নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিষ্ঠাতাদের অনুমোদন ছাড়া এমন বোর্ড গঠন বৈধ কি না, তা বিতর্কিত।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নতুন ট্রাস্টি বোর্ডের কয়েকজন সদস্য পূর্বে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে আলতাফুন্নেসা প্রথম ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম জাকারিয়ার স্ত্রী। আবুল কাশেম চৌধুরী ছিলেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। সন্ধ্যা রায় ও মনজুর কাদিরকে ২০২৩ সালে দুর্নীতির অভিযোগে প্রতিষ্ঠান থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়। পরবর্তীতে তারা নতুন কাঠামোয় আবার যুক্ত হন। বর্তমানে সন্ধ্যা রায় মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বে এবং মনজুর কাদির ফার্মাসিউটিক্যালস শাখার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন বলে জানা যায়।
অন্যদিকে একটি নথিতে দেখা যায়, ২০২২ সালের ২০ অক্টোবর ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী একক সিদ্ধান্তে আলতাফুন্নেসাকে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোনীত করেন। ওই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাকে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হয়। তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে তখনই ভেতরে আপত্তি ওঠে বলে জানা যায়। ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ লিখিতভাবে ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করে। এদিকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে এখনো ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ একাধিক ব্যক্তির নাম ও ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে, যা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ডা. নাজিমউদ্দিনের বিস্ফোরক অভিযোগ: ডা. নাজিম উদ্দিনের অভিযোগ, তাঁকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে সরানোর পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও শিরিন হক। আরো ছিলেন কাসেম চৌধুরী এবং আগে বহিষ্কৃত কয়েকজন কর্মকর্তা—মহিবুল্লাহ মঞ্জু, আব্দুল কাদের ও সন্ধ্যা রায়।
ডা. নাজিমউদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিভিন্ন বিভাগে অডিট শুরু করেন এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেন। তাঁর দাবি, এই পদক্ষেপের পরই একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ট্রাস্ট কাঠামো নিয়ে তিনি বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানের একমাত্র জীবিত প্রতিষ্ঠাতা-ট্রাস্টি। কিন্তু শিরিন হকের নেতৃত্বে জাল দলিলের মাধ্যমে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ কয়েকজনকে নিয়ে একটি নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে, যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নেই। তাঁর মতে, এটি আইন ও প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার পরিপন্থী।
ডা. নাজিমউদ্দিন আরও অভিযোগ করেন, সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে অর্ধশতাধিক বহিরাগত প্রবেশ করে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তাঁর দাবি, চাপের মুখে তিনি একটি কাগজে স্বাক্ষর করেন, যেখানে লেখা ছিল তিনি স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিচ্ছেন। তবে তিনি এটিকে আনুষ্ঠানিক পদত্যাগ নয় বলে দাবি করেন এবং ট্রাস্টি হিসেবে তাঁর অধিকার বহাল আছে বলে জানান।
তিনি আরও বলেন, পরিকল্পিতভাবে ‘মব’ তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে। ওই ঘটনায় নথিপত্র এলোমেলো করা, আলমারি ভাঙচুর এবং কিছু মালপত্র ও মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের অভিযোগও তিনি তোলেন। ডা. নাজিমউদ্দিনের দাবি, বর্তমানে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র একটি “অবৈধ নিয়ন্ত্রণে” পরিচালিত হচ্ছে এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় তিনি সরকারের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে দাবি করা হয়, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৩ সালের আগস্ট থেকেই। সে সময় সাভারে একটি মব পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. গিয়াস উদ্দিন আহমেদকে অপমান করে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই ঘটনাই ছিল নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। এরপর ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন এনে নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করার চেষ্টা চলে বলে দাবি করা হয়। ডা. গিয়াস উদ্দিন আহমেদের বিষয়ে আরও জানা যায়, ঘটনার পর তিনি দেশের বাইরে চলে যান। বর্তমানে তিনি আর্জেন্টিনার একটি প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থান করছেন বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ পাওয়া যায়।
কথিত ট্রাস্টি বোর্ড গঠন ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন নিয়ে জানতে চাইলে মনজুর কাদির আহমেদ বলেন, বিষয়টি তিনি সরাসরি বলতে পারবেন না, এটি আইন উপদেষ্টা দেখেন। তিনি আরও বলেন, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হলেও তিনি আলাদা কোনো দায়িত্বে সরাসরি যুক্ত নন। অন্যদিকে আইন ও প্রশাসন বিভাগের সহকারী পরিচালক সোহেল রানা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করে বলেন, বিষয়টি জটিল এবং সরাসরি আলোচনায় বসতে হবে। সন্ধ্যা রায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সূত্র: কালের কন্ঠ
সিভি/এম

