সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও বিপুল অঙ্কের বকেয়া রাজস্ব পরিশোধে দীর্ঘদিন ধরে গড়িমসি করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড। সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠানটির বকেয়া শুল্ক-কর দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৬২ কোটি ৪৯ লাখ টাকার বেশি। অথচ একই সময়ে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করে যাচ্ছে কোম্পানিটি।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের আমদানি সংশ্লিষ্ট রাজস্ব আদায়ে একাধিকবার তাগিদ দেওয়া হলেও পুরো অর্থ এখনো আদায় করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত পাওনা ছিল ১ হাজার ৫৬২ কোটি ৪৯ লাখ ৫৯ হাজার ৮৬৩ টাকা। এর মধ্যে মেঘনা পেট্রোলিয়াম পরিশোধ করেছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। ফলে বর্তমানে বকেয়া রয়েছে ১ হাজার ৩৬২ কোটি ৪৯ লাখ ৫৯ হাজার ৮৬২ টাকা।
কাস্টমস বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী আমদানি পর্যায়েই শুল্ক, ভ্যাট, আগাম কর ও আয়কর পরিশোধ বাধ্যতামূলক। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত সময়ে এসব রাজস্ব পরিশোধ করেনি। ইতোমধ্যে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থ জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা পড়েনি।
এনবিআর ও কাস্টমস সূত্রে আরও জানা যায়, বিপিসির অধীন একাধিক প্রতিষ্ঠান আমদানি করা পণ্যের বিপরীতে যথাযথ শুল্ক-কর পরিশোধে অনিয়ম করছে। এ বিষয়ে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ৪৬৩টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে এই বিপুল অঙ্কের রাজস্ব বকেয়া রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হলে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা শুনানিতে অংশ নেন। তারা লিখিত ও মৌখিক বক্তব্যে পরিশোধিত অর্থের হিসাব সঠিক নয় বলে স্বীকার করেন। তবে তাদের দাবি, ইনভয়েস মূল্যের ভিত্তিতে কেবল কাস্টমস ডিউটি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। একই সঙ্গে প্রকৃত রাজস্ব নির্ধারণে পৃথক কমিটি গঠনের প্রস্তাবও দেন তারা। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করে।
আইন অনুযায়ী, কাস্টমস আইন ১৯৬৯, মূল্য সংযোজন কর আইন ২০১২ এবং আয়কর আইন ২০২৩ অনুসারে আমদানি পর্যায়েই সব ধরনের শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হয়। তাগিদপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া অর্থ পরিশোধ না হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, বকেয়া রাজস্ব পরিশোধে গড়িমসি করলেও মুনাফার দিক থেকে শক্ত অবস্থানে রয়েছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম। গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা কর-উত্তর মুনাফা করেছে। গড়ে প্রতি বছর মুনাফা প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা।
বছরভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির কর-উত্তর মুনাফা ছিল ৬৬৪ কোটি ৩২ লাখ ১৯ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৪২ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪৪২ কোটি ১৪ লাখ টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩১৬ কোটি ৫৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৮২ কোটি ১৪ লাখ টাকা মুনাফা করে প্রতিষ্ঠানটি। ধারাবাহিক এই প্রবৃদ্ধির মধ্যেই বড় অঙ্কের রাজস্ব বকেয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বকেয়া অর্থ পরিশোধের বিষয়ে জানতে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহীরুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

