যুদ্ধক্ষেত্রে অন্য দেশের সেনাবাহিনীর পোশাক পরে যেসব ভিনদেশি যোদ্ধা লড়াই করে, তাদের বলা হয় ‘প্রক্সি ফোর্স’। বাংলাদেশে তেমন কোনো সম্মুখযোদ্ধা না থাকলেও এখন অপরাধের জগতে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ছদ্মবেশী ‘প্রক্সি বাহিনী’, যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে সড়ক ও নগরজীবনে ভয় ছড়িয়ে দিচ্ছে।
র্যাব বা ডিবি পুলিশের মতো জ্যাকেট, হ্যান্ডকাফ, পিস্তল, ওয়াকিটকি—সবই তাদের হাতে থাকে। দেখে বোঝার উপায় থাকে না এটি আসল অভিযান নাকি সাজানো অপারেশন। টার্গেট করা ব্যক্তিকে গাড়িতে তোলার সময় মনে হয়, যেন কোনো অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বাস্তবে এটি এক ভয়ংকর ডাকাত চক্রের কৌশল।
রাজধানীর উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরে গত ২৫ এপ্রিল ব্যবসায়ী সালমান মাহবুব জয়কে র্যাব পরিচয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে ৬৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত দুইজনকে পরে গ্রেপ্তার করে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তারদের মধ্যে একজন চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্য বলেও জানা যায়।
এর আগে গত শুক্রবার রাজধানীর ডেমরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক ব্যবহার করে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
অন্যদিকে, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকায় ডিবি পরিচয়ে সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে প্রায় ১৪ টন রড ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় র্যাব, ডিবি ও অন্যান্য বাহিনীর নাম ব্যবহার করে ছিনতাই ও ডাকাতির প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। পুলিশ সদর দপ্তর–এর পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারা দেশে ১৩৩টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে ঘটেছে ১২টি। একই সময়ে দস্যুতার মামলা হয়েছে ৪৩৯টি, যার মধ্যে ঢাকায় মামলা ৭৬টি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ডাকাত চক্র এখন দুই ভাগে কাজ করছে। একদল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণের পর লুটপাট চালায়। আরেক দল ধনাঢ্য বাসাবাড়ি রেকি করে রাতে ডাকাতি করে। এই চক্রে যুক্ত হচ্ছে চাকরিচ্যুত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরাও।
গ্রেপ্তার এড়াতে তারা বস্তির নারী ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করে। একটি সিম খুব অল্প সময়ই ব্যবহার করা হয়। বাসাবাড়ি টার্গেট করার আগে সড়কের বিভিন্ন স্থানে আঁকা হয় বিশেষ সংকেত, যা অপারেশন টিমকে নির্দেশনা দেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ও ভয়কে কাজে লাগিয়ে এসব চক্র অপরাধ আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
একটি বড় ঘটনার উদাহরণ হিসেবে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট রাতে রাজধানীর মাটিকাটার বিক্রমপুর কটেজে ১২-১৩ সদস্যের একটি চক্র স্বর্ণালংকার, মোবাইলসহ প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল লুট করে। পরে এই চক্রের অন্যতম হোতা ১৭ মামলার আসামি আলী হোসেন ওরফে ‘চোরা আলী’সহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
তদন্তে জানা গেছে, তাদের একটি ‘রেকি টিম’ সন্ধ্যার পর এলাকা ঘুরে বাসা টার্গেট করে এবং অপারেশন টিমের জন্য সড়কে সংকেত এঁকে রেখে যায়। লুটের মালামাল ভাগবাঁটোয়ারার ক্ষেত্রে যাদের নামে বেশি মামলা, তাদেরই বেশি অংশ দেওয়া হতো। গ্রেপ্তার এড়াতে তারা বিভিন্ন বস্তির নারীদের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করত, যেখানে একটানা ১৫-২০ মিনিটের বেশি কথা বলা হতো না।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, এসব সংঘবদ্ধ চক্র প্রযুক্তির অপব্যবহার ও কৌশল পরিবর্তন করে কাজ করায় পুরোপুরি নির্মূল করতে সময় লাগছে। তবে প্রতিটি ঘটনার পর দ্রুত অভিযান চালিয়ে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

