দেশত্যাগকে পাচার হিসেবে না দেখে বরং জাতীয় উন্নয়নের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সাবেক জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক। তার মতে, সরকারের দায়িত্ব হলো বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও ঝুঁকিমুক্ত করা।
তিনি বলেন, বিদেশি নিয়োগকর্তাদের পাঠানো ওয়ার্ক পারমিট, কর্মী ভিসা এবং অন্যান্য নথি দেশ ছাড়ার আগেই বিএমইটির পোর্টাল ও সংশ্লিষ্ট বিদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাইয়ের সহজ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এতে ভুয়া কাগজপত্র ও প্রতারণার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, বিএমইটির সাবেক প্রধান হিসেবে তিনি বিদেশে কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। তার ভাষায়, মানব পাচারকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে বিষয়টি একটি সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত সমস্যা।
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত, যাদের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করছেন। বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি কর্মীদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। তার পর্যবেক্ষণে, বিদেশে যাওয়া এসব কর্মীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশের কর্মীদের তুলনায় কম হলেও বিএমইটি জেলা পর্যায়ের কার্যালয় ও টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠায়।
তিনি আরও জানান, পাচারের শিকার হিসেবে চিহ্নিত মানুষের সংখ্যা বছরে সাধারণত ২৩০ জনের বেশি নয়। এসব ব্যক্তি মূলত সঠিক তথ্য না জেনে, দালাল ও প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তার মতে, বিদেশে কল্পিত উচ্চ আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কিছু অসাধু চক্র বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে, যেখানে বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার খরচ তুলনামূলক অনেক কম।
তিনি আরো যোগ করেন , বিএমইটি নিয়মিতভাবে জেলা পর্যায়ে সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার ও তথ্য প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এ কাজে আইএলও, ইউএনডিপি এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) সহযোগিতা করে।
আইওএম বিদেশে বিপদে পড়া কর্মীদের সহায়তা, চিকিৎসা, প্রত্যাবাসন, লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পুনর্বাসনে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, বিদেশে যাত্রার প্রতিটি ধাপ—নিবন্ধন থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান পর্যন্ত—সরকারি রেকর্ডে থাকা জরুরি। এর বাইরে যারা যায়, তারা অনেক সময় সরকারি সহায়তার বাইরে থেকে যায়।
তিনি বলেন, ভুয়া ভিসা, ভুয়া নিয়োগপত্র ও ভুয়া নিয়োগকর্তার কারণে অনেকেই বিপদে পড়েন। তবে বিএমইটি ও বাংলাদেশ দূতাবাস এসব ক্ষেত্রে নাগরিকদের সহায়তায় সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিগামী নৌকাডুবিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনাগুলোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব ঘটনা দুঃখজনক হলেও সংখ্যার দিক থেকে তা সামগ্রিক অভিবাসী সংখ্যার তুলনায় অল্প। তিনি আরও বলেন, মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে শুধু দমননীতি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
তার মতে, দেশে কর্মসংস্থানের সংকটই এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের অন্যতম কারণ। পাশাপাশি বিদেশ যাত্রায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, বিমান ভাড়া সাধারণত কম হলেও অনেক ক্ষেত্রে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়, যা অভিবাসন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।
বর্তমানে অনেক লাইসেন্সধারী আদম ব্যবসায়ী পলাতক রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। নিরাপত্তা চেকপোস্ট, ইমিগ্রেশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি সঠিকভাবে পাসপোর্ট ও ভিসা যাচাই করে সন্দেহজনক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে পাচারের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ বৈধভাবে বিদেশে গিয়ে সফল হচ্ছেন। পাশাপাশি একটি অংশ উচ্চ শিক্ষার জন্য উন্নত দেশে যাচ্ছে, যাকে তিনি মেধা অভিবাসন হিসেবে উল্লেখ করেন।
সবশেষে তিনি বলেন, অভিবাসনকে “পাচার” হিসেবে না দেখে উন্নয়নের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত। সরকারের দায়িত্ব হলো এই পথকে নিরাপদ, সহজ ও নিয়ন্ত্রিত করা।
- লেখক: মাসুদ আহমেদ, সরকারের প্রাক্তন সিনিয়র সচিব ও প্রজাতন্ত্রের প্রাক্তন কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল

