ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে নগদহীন লেনদেন এখন আর কেবল ভবিষ্যতের ধারণা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা। বাজারের কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিদেশে জরুরি খরচ—সবখানেই প্লাস্টিক কার্ড হয়ে উঠেছে নির্ভরতার প্রতীক। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই সুবিধার পাশাপাশি বাড়ছে জালিয়াতি ও সাইবার প্রতারণার আশঙ্কাও। ফলে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমনি গুরুত্ব পাচ্ছে গ্রাহকের সচেতনতা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে কার্ডভিত্তিক লেনদেন গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষে দেশে মোট কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১৮ লাখের বেশি। গত পাঁচ বছরে কার্ডে লেনদেনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৪৩ শতাংশ। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ২০ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার ৪৪ কোটি টাকায়। এই প্রবৃদ্ধিকে দেশের অর্থনীতির দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্রাহক সুরক্ষায় নতুন নীতিমালা:
কার্ড ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে চলতি বছরের মার্চে নতুন নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে গ্রাহকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ ঋণসীমা বাড়িয়ে ৪০ লাখ টাকা করা হয়েছে। এর মধ্যে জামানত ছাড়াই পাওয়া যাবে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা।
দীর্ঘদিনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সুদের হারেও নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে। এখন বকেয়া অর্থের ওপর সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ সুদ আরোপ করা যাবে। বিল পরিশোধে দেরি হলে একাধিকবার জরিমানা আদায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া কার্ড চালুর আগে কোনো ধরনের ফি নেওয়া যাবে না বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বকেয়া আদায়ের নামে গ্রাহক বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের মানসিক কিংবা শারীরিকভাবে হয়রানি করা যাবে না—এমন কঠোর অবস্থানও নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে কার্ডধারীরা তাঁদের মোট সীমার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ অর্থ তুলতে পারবেন। ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্যও সাপ্লিমেন্টারি কার্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
কার্ড জালিয়াতি ঠেকাতে এখন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে ইভিএম চিপ প্রযুক্তি। আগে ব্যবহৃত ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ থেকে তথ্য চুরি করা তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু আধুনিক চিপ প্রযুক্তিতে প্রতিবার লেনদেনের সময় নতুন গোপন সংকেত তৈরি হয়। ফলে একবার তথ্য পেলেও তা পুনরায় ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে দুই ধাপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অনলাইনে কেনাকাটার সময় এখন কার্ডের তথ্যের পাশাপাশি মুঠোফোনে পাঠানো এককালীন পাসওয়ার্ডও প্রয়োজন হয়। বায়োমেট্রিক প্রযুক্তিও নিরাপত্তায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আঙুলের ছাপ কিংবা মুখ শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে, প্রকৃত গ্রাহকই কার্ড ব্যবহার করছেন।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে যাচ্ছে প্রতারকদের কৌশলও। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতির একটি হলো সামাজিক কৌশলভিত্তিক প্রতারণা। ব্যাংকের পরিচয় দিয়ে ফোন বা ই-মেইলের মাধ্যমে গ্রাহকের পিন নম্বর কিংবা এককালীন পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। লোভনীয় অফারের ফাঁদে ফেলে ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে কার্ডের তথ্য সংগ্রহের ঘটনাও বাড়ছে। অনিরাপদ অনলাইন দোকান কিংবা গেমিং সাইটে তথ্য শেয়ার করেও অনেকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বিদেশে ই-সিম ব্যবহারের পর তা বন্ধ করতে ভুলে যাওয়া বা অনলাইন সাবস্ক্রিপশন চালু রেখে দেওয়ার কারণেও অনেক গ্রাহক বড় অঙ্কের অপ্রত্যাশিত বিলের সম্মুখীন হচ্ছেন।
কার্ড নিরাপত্তার বিষয়ে সিটি ব্যাংক পিএলসির কার্ড বিভাগের প্রধান তৌহিদুল আলম বলেন, কার্ড ব্যবহারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সবসময় গ্রাহকের হাতেই থাকা উচিত। কার্ডের পেছনে থাকা সিভিভি নম্বর কখনো অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করা উচিত নয়। তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় প্রতিটি পজ মেশিন ও মুঠোফোনই একেকটি পেমেন্ট ডিভাইসের মতো কাজ করে। তাই অপরিচিত কারও হাতে কার্ড তুলে দেওয়া বা অসতর্কভাবে ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তাঁর মতে, ট্যাপ অ্যান্ড পে বা এনএফসি প্রযুক্তির এই সময়ে নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় স্তম্ভ হলো ব্যক্তিগত সচেতনতা। অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশ্বস্ত ও যাচাইকৃত ওয়েবসাইট ব্যবহার করতে হবে এবং সন্দেহজনক কোনো লিংকে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

