ছোট ছোট মিছিল। উত্তেজনায় ফুঁসে ওঠা তরুণদের কণ্ঠে স্লোগান। রাজপথজুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ। সেই সময় ঘটনাস্থলে ছুটে বেড়িয়েছেন সাংবাদিকরা। কেউ ক্যামেরায় ধরে রেখেছেন উত্তাল মুহূর্ত, কেউ সরাসরি সম্প্রচার করেছেন মোবাইল ফোনে, আবার কেউ পাঠিয়েছেন টানা সংবাদ আপডেট। কঠোর নজরদারি, হুমকি, হামলা আর নানা বাধা উপেক্ষা করেই তাঁরা পৌঁছে দিয়েছেন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ খবর।
তবে সব খবর প্রকাশের সুযোগ পায়নি। অনেক তথ্য চাপা পড়ে গেছে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের দেয়ালে। তবু থেমে থাকেননি সংবাদকর্মীরা। ঝুঁকি নিয়েই তাঁরা তুলে ধরেছেন রাজপথের বাস্তবতা। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটে কর্তৃত্ববাদী সরকারের। বদলে যায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পরই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হন সাংবাদিকেরা।
আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একের পর এক মামলা দায়ের হতে থাকে। আর সেই মামলার তালিকায় উঠে আসে এমন বহু মানুষের নাম, যাঁদের হাতে অস্ত্র নয়, ছিল কলম, ক্যামেরা, বুম কিংবা মাইক্রোফোন। অর্থাৎ, তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারের দায়িত্ব পালন করা সাংবাদিকদেরই অনেককে করা হয় আসামি।
৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রায় দেড় বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যাঁরা জীবনঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরে মামলার আসামিতে পরিণত হয়েছেন। যে মানুষগুলো রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরেছিলেন, তাঁদেরই দাঁড়াতে হয়েছে আইনের কাঠগড়ায়। অনেকের কাছে এটি ইতিহাসের নির্মম পরিহাস বলেই মনে হচ্ছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের প্রধান তিন স্তম্ভ হিসেবে ধরা হয়। আর সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। কারণ ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের ওপর নজরদারির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গণমাধ্যম। তবে আইনবিদ ও বিশিষ্টজনদের একাংশের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে ও পরের বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবেই সংবাদমাধ্যমকে চাপে ফেলা হয়েছে।
এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। হত্যা, হত্যাচেষ্টাসহ অন্তত ৪৯টি মামলায় দেশের ২৮২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে বলে তথ্য মিলেছে।
এর মধ্যে ১৭৪ জন সাংবাদিক হত্যা মামলার আসামি হয়েছেন। ১২ জনের বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যাচেষ্টার মামলা। আরও ৩৭ জনকে নাশকতার মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। এসব মামলার কারণে অনেক সাংবাদিক আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্র নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অন্তত ৮১৪ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।
সংগঠনটির পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়ে সবচেয়ে বেশি সাংবাদিক সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন। সংখ্যাটি ৫৮৫। এছাড়া হত্যা মামলায় জড়িয়েছেন ১৭৪ জন, হত্যাচেষ্টা মামলায় ১২ জন এবং নাশকতার মামলায় ৩৭ জন সাংবাদিক। একই সময়ে সরাসরি হত্যার শিকার হয়েছেন ছয়জন সংবাদকর্মী।
পরিসংখ্যান বলছে, সাংবাদিক নির্যাতনের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে ২০২৫ সালে। ওই বছরই সবচেয়ে বেশি সংবাদকর্মী হামলা, মামলা ও নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ৬২২ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতনের মুখে পড়েন। এর মধ্যে ৪৫৮ জন সরাসরি হামলার শিকার হন। হত্যা মামলায় জড়ানো হয় ১৪০ জনকে। নাশকতার মামলায় অভিযুক্ত করা হয় আরও ২১ জন সাংবাদিককে। একই বছরে একজন সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে ১৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হন। এই সময়ে ৮৫ জন হামলার মুখে পড়েন। হত্যা মামলায় জড়ানো হয় ৩১ জনকে। হত্যাচেষ্টার মামলার শিকার হন ১০ জন এবং নাশকতার মামলায় অভিযুক্ত হন ১৬ জন সাংবাদিক। একই সময়ে নিহত হন পাঁচজন সংবাদকর্মী।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্তও পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানিয়েছে, এই সময়ে অন্তত ৪৫ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪২ জন হামলার শিকার এবং তিনজন হত্যা মামলার আসামি হয়েছেন।
অন্য মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যেও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে অন্তত ৪২৭টি হামলার ঘটনায় ৮৩৪ জন সাংবাদিক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় ছয়জন নিহত, ৩৭৯ জন আহত, ১০৩ জন হুমকি এবং ৩৩ জন গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ৪৯টি মামলায় ২২২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি। এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২১৮ জন সাংবাদিক হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ৪৯৬ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে হয়রানির মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে ১৮৯ জন সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন বলেও তথ্য দিয়েছে সংস্থাটি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার বিষয়ে গতকাল নতুন তথ্য দিয়েছেন মাহফুজ আনাম। সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম জানান, বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ২৮২ জন সাংবাদিকের একটি তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত রয়েছেন ৯৪ জন সাংবাদিক। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সাংবাদিকদের জানান, মামলায় জড়ানো সাংবাদিকদের বিষয়ে প্রতিকারের উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগেই নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলো প্রমাণ করা কঠিন হবে। এতে প্রকৃত ভুক্তভোগী পরিবারও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারে। কারণ ভুল বা কাল্পনিক আসামি যুক্ত হলে বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে সাংবাদিকদের হয়রানির প্রসঙ্গে মনজিল মোরসেদ বলেন, বাংলাদেশের আইনে এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের ধারা নেই। তাঁর মতে, এটি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত একটি ট্যাগে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকরা আইনি প্রতিকার না পেলেও ভবিষ্যতে অন্যায় ও হয়রানির বিরুদ্ধে তাঁরা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
প্রশ্নবিদ্ধ মামলার গল্প:
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে বেশ কিছু বিস্ময়কর তথ্য পেয়েছে অনুসন্ধানী সেল। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক মামলা এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিপরীতে সাংবাদিকদের অবস্থান করানো যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিহত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা মামলা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণাই রাখেন না। এমনকি বাদী কিংবা আসামিদের অনেককেই তাঁরা চেনেন না।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ী সাতভিটা এলাকার আশিকুর রহমানের ঘটনা। চাঁদ মিয়ার ছেলে আশিক দীর্ঘদিন ধরে ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত ছিলেন। আন্দোলনের সময় চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পিজি হাসপাতালে এসে জানতে পারেন, ছাত্র পরিচয় দিলে বিনা খরচে চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায়।
তদন্তে জানা যায়, পরিবারের এক স্বজনের পরিকল্পনায় বিবাহিত ও অছাত্র আশিককে ছাত্র পরিচয়ে উপস্থাপন করা হয়। আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলেও পরে তাঁকে আন্দোলনকারী হিসেবে দেখানো হয়। মৃত্যুর পর তাঁকে জুলাই শহীদ হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সরকারি সহায়তাও মেলে তাঁর নামে। পরে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয় এবং সেই মামলায় আসামি করা হয় কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিককে। এই মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আব্দুল খালেক ফারুক, হুমায়ুন কবির সূর্য এবং ইউসুফ আলমগীর।
মামলার নথি অনুযায়ী, বাদী ছিলেন কুড়িগ্রাম পৌর ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি রুহুল আমিন। তবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন না। এরপরও কেন তিনি মামলার বাদী হলেন এবং কেন সাংবাদিকদের আসামি করা হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
সরাসরি সাক্ষাৎ করতে বলা হলে তিনি আপত্তি জানান। পরে মোবাইল ফোনে কথা বলতে গিয়ে প্রশ্ন শুনেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেন। তিনি বলেন, ‘আপনি তো স্বৈরাচারের দোসর।’ নিহতের পরিবারের সদস্যরা থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি বাদী হয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে রুহুল আমিন বলেন, জুলাইযোদ্ধা হিসেবে দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি মামলা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, মামলার এজাহারে যা লেখা হয়েছে, সেটাই সত্য। বাকি বিষয় আদালতেই প্রমাণ হবে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, তৎকালীন সদর থানার ওসি হাবিবুল্লাহ-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর উদ্যোগেই ঘটনাটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়। বর্তমানে নীলফামারীর ডোমার থানায় কর্মরত হাবিবুল্লাহ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, বিষয়টির সঙ্গে তিনি জড়িত নন।
একই ধরনের আরেকটি ঘটনা উঠে এসেছে পাশের জেলা লালমনিরহাটে। সরকার পতনের পর ‘স্বৈরাচারের দোসর নিধন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্থাপনার সাইনবোর্ড অপসারণ শুরু হয়। পাটগ্রাম উপজেলার কাউয়ামারি বাজারে আনন্দ মিছিল চলাকালে একটি কলেজের সাইনবোর্ড খুলতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান ইসলামপুর ঝালংগী এলাকার মাদরাসাছাত্র আজিজুল ইসলাম।
ঘটনার প্রায় ১১ মাস পর, গত বছরের ৩০ জুন একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলায় অন্যদের পাশাপাশি আসামি করা হয় দুই সাংবাদিককে। তাঁরা হলেন আজিজুল হক দুলাল এবং মামুন হোসেন সরকার।
রংপুরেও একই ধরনের আরেকটি ঘটনার তথ্য মিলেছে। ছাত্রদের আন্দোলন প্রতিহত করতে গিয়ে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট নিহত হন কাউনিয়া উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা মাহামুদুল হাসান মুন্না। পরে ওই বছরের ২৯ আগস্ট দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় ৫৪ নম্বর আসামি করা হয় হায়দার আলী বাবু-কে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, আলোচিত তিন ঘটনার দুজনকে পরে জুলাই শহীদ হিসেবেও গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত গেজেটে ব্রেন টিউমারে মারা যাওয়া আশিকুর রহমানের গেজেট নম্বর ছিল ২১৭। আর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত আজিজুল ইসলামের গেজেট নম্বর ছিল ৭১৮। গেজেটে স্বাক্ষর করেন উপসচিব হরিদাস ঠাকুর।
সাহায্যের আশ্বাস, পরে হত্যা মামলার আসামি:
রাজধানীর রামপুরা এলাকায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে নিহত হন সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী মো. রায়হান আকন। এ ঘটনায় তাঁর বাবা মো. কালাম আকন গত বছরের ২৮ মার্চ বাংলাদেশ পুলিশ-এর বাড্ডা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ওই মামলার প্রধান আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই মামলায় ২৭ নম্বর আসামি করা হয় সাংবাদিক মুজাহিদ প্রিন্স-কে। অথচ তিনি ঘটনার সময় রাজধানী থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে বরিশালে কর্মরত ছিলেন। শুধু এই মামলাই নয়, ঢাকার পল্টন এলাকায় দায়ের হওয়া আরেকটি হত্যাচেষ্টা মামলাতেও তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কীভাবে ঢাকার একটি ঘটনায় বরিশালের এক সাংবাদিক আসামি হলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধানে যায় প্রতিনিধি দল। পটুয়াখালীর সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নে গিয়ে কথা হয় মামলার বাদী কালাম আকনের সঙ্গে। তিনি দাবি করেন, মামলার বিষয়ে শুরুতে তিনি কিছুই জানতেন না। তাঁর ভাষায়, সাহায্য দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে স্থানীয় এক আইনজীবী তাঁর কাছ থেকে কয়েকটি কাগজে স্বাক্ষর নেন। পরে তিনি জানতে পারেন, সেগুলো মামলার নথি ছিল।
কালাম আকন বলেন, ‘আমি সাধারণ মানুষ। সাহায্যের কথা বলে গ্রামের প্রতিবেশী আইনজীবী মশিউর রহমান কিছু কাগজে সই নিয়েছিলেন। পরে জানতে পারি, সেটা মামলা করার জন্য ব্যবহার হয়েছে। সেখানে পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার শত শত মানুষকে আসামি করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, মামলার আসামির তালিকায় তাঁর পরিচিত ও আত্মীয়স্বজনদের নামও রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, নিরীহ মানুষ, সাংবাদিক ও সরকারি চাকরিজীবীদের আসামি করে মামলা বাণিজ্য করা হয়েছে। তিনি সরকারের কাছে নিরপরাধ ব্যক্তিদের মামলা থেকে অব্যাহতির দাবি জানান।
অনুসন্ধানে অভিযোগ ওঠে, মাদারবুনিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আবু হানিফ এবং তাঁর ছেলে আইনজীবী মশিউর রহমান এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে মামলা বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
গত বছরের অক্টোবরে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মশিউর রহমান ও বাদী কালাম আকনের কথোপকথনের অডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে শোনা যায়, বিভিন্ন ধরনের সুবিধা ও ভাতার আশ্বাস দিয়ে মামলা করতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছিল। কথোপকথনে মশিউর রহমান বলেন, শহীদদের জন্য ভবিষ্যতে ভাতার ব্যবস্থা হতে পারে এবং মামলা না করলে কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে না।
একই প্রতিবেদনে আরও একটি গোপন অডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে পটুয়াখালীর লোহালিয়া এলাকার জসিম উদ্দিন রানা সিকদার-এর সঙ্গে মামলার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে আলোচনা শোনা যায়। অডিওতে মামলার আসামিদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথাও উঠে আসে। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল বিকেলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মশিউর রহমানের ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে অডিও রেকর্ডগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন পটুয়াখালী জেলা প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি কাইয়ুম জুয়েল। তিনি বলেন, রেকর্ড প্রকাশের পর ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র সামনে আসে। পরে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি পদ থেকে আবু হানিফকে বহিষ্কার করা হয়।
অন্যদিকে মামলার আসামি হওয়া সাংবাদিক মুজাহিদ প্রিন্স বলেন, তিনি পেশাগত দায়িত্ব ছাড়া কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। বর্তমানে তিনি পটুয়াখালী জেলা টেলিভিশন জার্নালিস্ট ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। প্রিন্সের দাবি, ঢাকার যেসব ঘটনার মামলায় তাঁর নাম এসেছে, সেগুলোর সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। একের পর এক মামলায় আসামি হওয়ায় পরিবার নিয়ে মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটছে বলেও জানান তিনি।
মামলা বাণিজ্যের ফাঁদে আরো ৩ সাংবাদিক:
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টো পাশে নিহত হন আফতাবনগরের বাসিন্দা আল-আমিন। ঘটনার কয়েক মাস পর তাঁর চাচা রহমান মাল আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও বিস্ময়কর তথ্য। একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় করা হয় আরেকটি মামলা। আর সেই মামলার ৮৪ নম্বর আসামি করা হয় বরিশালের তিন সাংবাদিককে, যাঁদের সঙ্গে ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাতিরঝিল থানার ওই মামলার বাদী মো. মোজাহারুল-কে চেনেন না নিহত আল-আমিনের পরিবারের সদস্যরা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
সরকারি তালিকায় আল-আমিনের নাম জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নিহতদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু পরিবারের দাবি, এখনো তাঁরা কোনো আর্থিক সহায়তা পাননি। অথচ তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে চলছে মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ। একই ঘটনার দুটি মামলায় ঘটনাস্থলের বর্ণনাতেও মিল পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
নিহতের চাচা রহমান মাল ও পরিবারের অন্য সদস্যরা জানান, হাতিরঝিল থানার মামলার বিষয়টি তাঁরা জানতে পারেন পুলিশ সূত্রে এবং এক আসামির মাধ্যমে। তাঁদের প্রশ্ন, পরিবারের অজান্তে একই ঘটনায় কীভাবে একাধিক মামলা হলো এবং কী উদ্দেশ্যে অন্য ব্যক্তি বাদী হলেন।
এ ধরনের মামলাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের মধ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ। অনেকের অভিযোগ, ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা অন্য উদ্দেশ্যে তাঁদের মামলায় জড়ানো হচ্ছে। এতে অনেকে নিজ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এই মামলার আসামি হওয়া তিন সাংবাদিক হলেন এস এম জাকির হোসেন, এম মিরাজ হোসাইন এবং তৌহিদুল মাজিদ মীর্জা রিমন। মামলার বাদী মোজাহারুলের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
ছাত্রলীগকর্মী থেকে ‘জুলাইযোদ্ধা’, পরে হত্যা মামলা:
সিরাজগঞ্জে ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের সহিংসতাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। আসিফ ও শাহীন নামে দুই তরুণ নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলায় অন্যদের পাশাপাশি আসামি করা হয়েছে দুই সাংবাদিককেও। তাঁরা হলেন ইজরাইল হাসান বাবু এবং সুজিত সরকার। মামলার বাদী আসমানী বেগম।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই দিন তৎকালীন সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরি-র বাসভবনে আটকে রেখে আসিফ ও শাহীনকে হত্যা করা হয়। সেখানে তাঁদের ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। তদন্তে জানা যায়, নিহত দুই তরুণ মূলত ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। এর আগের দিন সিরাজগঞ্জে সহিংস ঘটনায় বিএনপির তিন নেতাকর্মী নিহত হওয়ার পর পুরো শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা স্থানীয় সংসদ সদস্যের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলে সেখান থেকে দুইজনের অগ্নিদগ্ধ কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।
অনুসন্ধানের সময় বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ফুটেজ হাতে আসে। সেসব ফুটেজে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ এবং আন্দোলনে আসিফ ও শাহীনকে সামনের সারিতে দেখা যায়। ৪ আগস্ট শহরের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তাঁরা এমপির বাসভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। পরে সেখানেই তাঁদের মৃত্যু হয়।
মামলার আসামি হওয়া সাংবাদিক ইজরাইল হাসান বাবুর দাবি, স্থানীয় একটি পক্ষ ও কয়েকজন সমন্বয়কের যোগসাজশে নিহত আসিফের মা আসমানী খাতুনকে বাদী করা হয়। তাঁর অভিযোগ, মামলাটিতে জেলার প্রায় সব উপজেলা থেকেই আসামি করা হয়েছে। শুধু সাংবাদিক নন, ব্যবসায়ী এমনকি কয়েকজন প্রবাসীকেও মামলায় যুক্ত করা হয়েছে। তাঁর মতে, পুরো বিষয়টি ছিল অর্থ বাণিজ্যকেন্দ্রিক। বাবু আরও বলেন, ঘটনার শুরুতে নিহত দুইজনকে ছাত্রলীগ সমর্থক হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় তিন মাস পর তাঁদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী দাবি করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
বাদীর বক্তব্য জানতে মামলার এজাহারে থাকা নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ফোন ধরেন মো. শাহানুর নামে এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে বাদীর ফুপাতো ভাই পরিচয় দেন। তাঁর দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী শহরের একডালা পুনর্বাসন এলাকায় আসমানী খাতুনের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন বাদীর ভাই যুবলীগ নেতা মো. নসিব-ও। বিষয়টি নিয়েও এলাকায় আলোচনা তৈরি হয়েছে।
মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জ সদর থানার এসআই ও তদন্ত কর্মকর্তা মো. সোহাগ বলেন, মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। আদালতে এখনো কোনো প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। তবে তদন্তের স্বার্থে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি।
ওসির কেরামতিতে মামলার বাদী!:
জয়পুরহাটে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনের সময় আহত হয়ে কালাই হাসপাতালে মারা যান শিক্ষার্থী নজিবুল সরকার বিশাল। তাঁর বাড়ি পাঁচবিবি উপজেলার রতনপুর গ্রামে। ঘটনার দুই সপ্তাহ পর, ১৮ আগস্ট তাঁর বাবা মজিদুল সরকার মালেক বাদী হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-সহ ১২৮ জনের বিরুদ্ধে জেলায় প্রথম হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ওই মামলার ১২২ নম্বর আসামি করা হয় সাংবাদিক আলমগীর চৌধুরী-কে। মামলাটি আদালতে দাখিল করেন আইনজীবী আব্দুল মোমেন ফকির। বিস্ময়কর বিষয় হলো, তিনি শুধু মামলার আইনজীবী নন, সাক্ষীর তালিকায়ও তাঁর নাম রয়েছে। একই মামলায় তাঁর ছেলে এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্থানীয় নেতা এ এইচ হাসিবুল হক সানজিদ-এর নামও সাক্ষী হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী আব্দুল মোমেন ফকির বলেন, তিনি বাদীপক্ষের হয়ে আদালতে মামলা দাখিল করেছিলেন। পরে আদালত সেটিকে এজাহার হিসেবে থানায় পাঠালে তা জিআর মামলায় রূপ নেয়। তাঁর দাবি, এরপর মামলার কার্যক্রম সরকারের দায়িত্বে চলে যায়। তিনি আরও বলেন, আসামির তালিকা শুধু বাদীপক্ষ নয়, রাজনৈতিক নেতারাও দিয়েছেন।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা কেন—এমন প্রশ্নে তাঁর মন্তব্য ছিল আরও বিতর্কিত। তিনি বলেন, ‘হত্যা কেউ করে নাই। হত্যা এমনি হয়ে গেছে। যাঁরা নিহত হয়, তারা এমনিই নিহত হয়।’ নিজে ও তাঁর ছেলের সাক্ষী হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য তাঁরা সাক্ষী হয়েছেন। তবে মামলায় সাংবাদিকদের নাম যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বাদী কিছু জানেন না বলেও দাবি করেন এই আইনজীবী।
অন্যদিকে নিহত শিক্ষার্থীর বাবা মজিদুল সরকার মালেক বলেন, তিনি কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দেননি। এমনকি অনেক আসামিকেই তিনি চেনেন না। তাঁর ভাষায়, ‘আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই কিন্তু কোনো নির্দোষ মানুষ শাস্তি পাক, সেটা চাই না।’ একই ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি নাশকতার মামলাতেও সাংবাদিক আলমগীর চৌধুরীকে আসামি করা হয়। সেই মামলার বাদী ছিলেন রাকিব হোসেন, যিনি আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
রাকিব হোসেন জানান, মামলার বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। তাঁর দাবি, আহত অবস্থায় হাসপাতালে থাকাকালে তৎকালীন ওসি এসে একটি কাগজে তাঁর স্বাক্ষর নেন। পরে তিনি জানতে পারেন, সাংবাদিকসহ ১১৯ জনের বিরুদ্ধে তাঁকে বাদী করে নাশকতার মামলা করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মামলার আসামি বা সাক্ষীদের কাউকেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত তৎকালীন ওসি হুমায়ুন কবির বর্তমানে কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, হাসপাতালে গিয়ে তিনি কখনো কারও স্বাক্ষর নেননি এবং এ ধরনের অভিযোগ সঠিক নয়।
জানা গেছে, দীর্ঘ ২৮ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে আলমগীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের পর দুটি হত্যা ও দুটি নাশকতার মামলা দায়ের করা হয়েছে। জয়পুরহাটে মামলার মুখে পড়া অন্য সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন রফিকুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, হারুনুর রশিদ এবং সুমন চৌধুরী।
সাংবাদিক খুনে নীরবতা, মামলায় উল্টো চিত্র:
বিভিন্ন হত্যা ও নাশকতার মামলায় সাংবাদিকদের নাম জড়ানোর অসংখ্য অভিযোগ উঠলেও সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় দেখা গেছে ভিন্ন বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রে মামলা হয়নি, আবার কোথাও মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও। এমনই একটি ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সাংবাদিক প্রদীপ কুমার ভৌমিক।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হামলায় নিহত হলেও তাঁর নাম জুলাই শহীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পরিবারের অভিযোগ, একাধিকবার আবেদন করেও ছাত্র সমন্বয়কদের বাধার কারণে সেই স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সকালে রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া মোড়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা পাশের রায়গঞ্জ প্রেস ক্লাবে আশ্রয় নেন। পরে সেখানে হামলা চালিয়ে সাংবাদিক প্রদীপ কুমার ভৌমিকসহ আওয়ামী লীগের পাঁচ নেতাকর্মীকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হামলায় আহত হন আরও অন্তত পাঁচজন সাংবাদিক। নিহত প্রদীপ কুমার ভৌমিক দৈনিক খবরপত্রের রায়গঞ্জ প্রতিনিধি এবং উপজেলা প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাঁর মরদেহের ময়নাতদন্ত হলেও এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি বলে জানা গেছে।
নিহত সাংবাদিকের ছেলে সুজন কুমার ভৌমিক বলেন, তাঁর বাবা কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে কয়েক দফা জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা তথ্য অফিসে আবেদন করা হলেও জুলাই শহীদের তালিকায় তাঁর নাম ওঠেনি। বরং তাঁকে আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মামলা, কারাবাস ও আত্মগোপনে সাংবাদিকরা:
জুলাই-পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া বিভিন্ন হত্যা ও সন্ত্রাসবিরোধী মামলার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু সাংবাদিকের জীবন ও জীবিকা সংকটে পড়েছে। অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন, কেউ আত্মগোপনে আছেন, আবার কেউ চাকরি হারিয়েছেন।
২০২৫ সালের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশ ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েকজন সাংবাদিককে বিভিন্ন মামলায় আসামি করে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মিজানুর রহমান বুলু, এ জেড আমিনুজ্জামান রিপন, এস এম সাব্বির হোসেন এবং মেহেদী হাসান। পরে দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকার পর তাঁরা জামিনে মুক্তি পান।
অন্যদিকে জে এম রউফ ২০২৪ সালের একটি হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার পর প্রায় দুই বছর ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন। তাঁর দাবি, ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও রাজনৈতিক পরিচয় ও পুরনো মতাদর্শিক অবস্থানের কারণে তাঁকে টার্গেট করা হয়েছে। মামলার পর নিরাপত্তার কারণে পরিবারকে গ্রামে পাঠাতে হয়েছে এবং তিনি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সিরাজগঞ্জে শহিদুল ইসলাম ফিলিপস-ও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে সাড়ে তিন মাস কারাগারে ছিলেন। তাঁর দাবি, ঘটনার সময় তিনি বাড়িতেই ছিলেন। পরে জামিন পেলেও চাকরি হারান এবং মামলার পেছনে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। এখনো আতঙ্কের মধ্যেই দিন কাটছে তাঁর। তাড়াশ উপজেলাতেও তিন সাংবাদিককে হামলার মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মামুন হোসাইন দীর্ঘ চার মাস কারাগারে ছিলেন। অন্য দুই সাংবাদিক মিনাল সরকার মিলু এবং আরিফুল ইসলাম এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন।
এদিকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন সংবাদপত্র মালিক সমিতির সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। তিনি জানান, গণ-অভ্যুত্থানের পর মামলার শিকার হওয়া ২৮২ জন সাংবাদিকের তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৯৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে।
তিনি বলেন, হয়রানিমূলক মামলাগুলোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, এসব মামলা বর্তমান সরকারের সময়ে হয়নি, বরং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গেছে। তিনি হত্যা মামলাগুলো পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন এবং হয়রানিমূলক মামলাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহারের কথাও বলেছেন। মতিউর রহমান চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন যে গত তিন মাসে কোনো সাংবাদিক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেনি এবং সাংবাদিকদের বিষয়ে সরকার নজর রাখবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—যে সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথের সত্য তুলে ধরেছিলেন, কেন তাঁদেরই দাঁড়াতে হলো হত্যার আসামির তালিকায়? কোথাও নিহতের পরিবার জানে না মামলার কথা, কোথাও সাহায্যের আশ্বাসে নেওয়া হয়েছে স্বাক্ষর, আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রতিশোধ কিংবা বাণিজ্যের অভিযোগে জড়িয়ে পড়েছেন নিরীহ মানুষ।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, যেসব সাংবাদিক সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই পাননি স্বীকৃতি কিংবা বিচার। ফলে এই দীর্ঘ ঘটনাপুঞ্জ শুধু কয়েকটি মামলার গল্প নয়; এটি রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা, রাজনীতি ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়ে বড় এক প্রশ্নচিহ্ন। সময় হয়তো একদিন এসব মামলার সত্য-মিথ্যা আলাদা করবে, কিন্তু ততদিন পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যাবে—সত্য প্রকাশ করাই কি ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় অপরাধ? সূত্র: কালের কন্ঠ
সিভি/এম

