ভালো চাকরি ও বিদেশে নেওয়ার লোভ দেখিয়ে দুই নারীকে ঢাকায় এনে আটকে রেখে মানবপাচার ও যৌন শোষণের চেষ্টা এবং একই সঙ্গে সাইবার প্রতারণার মাধ্যমে কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নেওয়ার একাধিক ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে রাজধানীতে।
এক ঘটনায় ‘মিষ্টি আক্তার’ (ছদ্মনাম) নামে এক নারী ভালো চাকরি ও বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে দুই তরুণীকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। পরে তাদের তুরাগের দলিপাড়া এলাকার একটি ফ্ল্যাটে আটকে রাখা হয়। সেখানে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে অবৈধভাবে বিয়ে দিয়ে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক করানোর চেষ্টা চলে বলে জানা যায়। একই সময়ে চীনা নাগরিক জেং ফান ও জিন শুচুনসহ একটি চক্র তাদের চীনে পাচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
প্রায় দুই মাস আটকে থাকার পর জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর গেলে র্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে দুই তরুণীকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় অভিযুক্ত নারী, চীনা নাগরিক জেং ফান ও জিন শুচুনকে গ্রেফতার করা হয়। তবে আরেক চীনা নাগরিক ঝেং ঝেন পালিয়ে যান। অন্যদিকে, মিরপুরের বাসিন্দা আফরোজা সুলতানার সঙ্গে ফেসবুকে ‘David Casboult’ নামে একটি আইডির পরিচয় হয়। নিজেকে লন্ডনের নাগরিক পরিচয় দিয়ে ধীরে ধীরে তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়। পরে জন্মদিন উপলক্ষ্যে বিদেশ থেকে উপহার পাঠানোর কথা বলে তাকে প্রলুব্ধ করা হয়।
কিছুদিন পর ভুক্তভোগীকে কাস্টমস কর্মকর্তা সেজে ফোন করা হয়। জানানো হয়, তার নামে একটি পার্সেল বিমানবন্দরে আটকে আছে। সেটি ছাড়াতে কাস্টমস ফি ও ভ্যাট দিতে হবে বলে ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠাতে বলা হয়। সরল বিশ্বাসে তিনি ধাপে ধাপে ১২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা পাঠান। পরে আরও অর্থ দাবি করা হলে তার সন্দেহ হয় এবং প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন।
এ ঘটনায় মামলা হলে ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের তদন্তে ভারতীয় নাগরিক এডউইন ডি কস্তার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। পরে প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ২২ এপ্রিল রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
শুধু এই দুটি ঘটনা নয়, সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় অন্তত ১০টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণে এমন প্রতারণার বিস্তার পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় প্রতারণা, মাদক, এটিএম জালিয়াতি, অনলাইন ক্যাসিনো, স্বর্ণ চোরাচালান ও মানবপাচারের মতো অপরাধের তথ্য উঠে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধে বিদেশিদের সম্পৃক্ততা দিন দিন বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে সংঘবদ্ধ প্রতারণা চালানো হচ্ছে। ফেসবুকে বন্ধুত্ব গড়ে তুলে বিদেশ থেকে গিফট পার্সেল পাঠানোর কথা বলে কাস্টমস ফি ও বিভিন্ন চার্জের নামে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অপরাধের নেপথ্যে কিছু বিদেশি নাগরিক মূল পরিকল্পনাকারী হলেও স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনে সহায়তা করছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হেরোইন, কোকেনসহ বিভিন্ন মাদক ব্যবসা, জাল ডলার, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, অনলাইন ক্যাসিনো ও মানবপাচারের মতো অপরাধেও বিদেশিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। অনেককে গ্রেফতার করা হলেও জামিনে বেরিয়ে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।
তদন্তে জানা যায়, চীন, ভারত, নাইজেরিয়া, কেনিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা এসব অপরাধে জড়িত। বাংলাদেশে এসে কেউ কেউ পাসপোর্ট নষ্ট করে ফেলে, যাতে তাদের প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়। এরপর রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বাসা বা হোটেল ভাড়া নিয়ে তারা অপরাধের ঘাঁটি গড়ে তোলে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে এক হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রায় এক লাখ বিদেশি অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রের ধারণা। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, দেশে ৩৩ হাজার ৬৪৮ জন অবৈধ বিদেশি অবস্থান করছেন। পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তাদের মতে, এদের একটি অংশ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত।
সূত্রগুলো বলছে, ঢাকায় অনেক দেশের দূতাবাস না থাকায় বিদেশি আসামিদের পরিচয় যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। এই সুযোগে কিছু বিদেশি দীর্ঘদিন ধরে অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এর মানে সব বিদেশি নাগরিক অপরাধী নয়। এ বিষয়ে বিশেষ পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, বিদেশিদের ভিসা ও অবস্থান নজরদারিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ অবস্থানকারীদের শনাক্ত করে জরিমানা, ব্ল্যাকলিস্ট ও প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম সাপোর্ট বিভাগের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, অনলাইন প্রতারণা ও সাইবার জালিয়াতির ঘটনায় বিদেশিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি মামলায় চীনা ও নাইজেরীয় নাগরিকদেরও গ্রেফতার করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, এসব অপরাধ এখন আন্তর্দেশীয় অপরাধে পরিণত হয়েছে। মাদক, মানবপাচার ও অনলাইন প্রতারণায় দেশি-বিদেশি চক্র একসঙ্গে কাজ করছে। এসব প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ ও সচেতনতা বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

