যেখানে আইন লঙ্ঘনের বিচার হয় এবং অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়, সেই আদালত প্রাঙ্গণেই প্রকাশ্যে চলছে তামাকজাত পণ্যের বিক্রি ও ধূমপান। রাজধানীর পুরান ঢাকার ব্যস্ত আদালত চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে এমন চিত্র দেখা গেলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল রোববার (৩১ মে) পালিত হয়েছে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’। তামাকের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির এই দিনে আদালত প্রাঙ্গণের বাস্তব চিত্র অনেকের কাছেই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, আদালত চত্বরের ভেতরে অন্তত ১০টি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়মিতভাবে তামাকজাত পণ্য বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে আদালতে আসা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে প্রকাশ্যে ধূমপান করতেও দেখা যায়। পুরো এলাকা জুড়ে এমন কর্মকাণ্ড যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত গত নয় মাস ধরে একই স্থানগুলোতে অস্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের নিয়মিত তামাক পণ্য বিক্রি করতে দেখা গেছে। এসব বিক্রেতা আদালত চত্বরের ভেতরেই অবাধে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। আদালত-সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। বছরের পর বছর ধরে একই পদ্ধতিতে আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রি হয়ে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে চললেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না বলে জানান তারা।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে কী বলা হয়েছে?
দেশে তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি আরও কঠোর হয়েছে আইন। ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ গত ১০ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির সম্মতির মাধ্যমে কার্যকর হয়। নতুন এই আইনে পাবলিক প্লেস, কর্মক্ষেত্র এবং তামাকজাত পণ্যের বিক্রির ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী, কোনো পাবলিক প্লেস বা গণপরিবহনে ধূমপান করা যাবে না। আদালত প্রাঙ্গণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গ্রন্থাগার, সরকারি ও বেসরকারি অফিসসহ সব ধরনের কর্মস্থল ‘পাবলিক প্লেস’-এর আওতাভুক্ত। ফলে আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে ধূমপান করা সরাসরি আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
সংশোধিত আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে, কেউ পাবলিক প্লেস বা গণপরিবহনে ধূমপান করলে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। একই ব্যক্তি পুনরায় একই অপরাধ করলে জরিমানার পরিমাণ ধাপে ধাপে দ্বিগুণ হবে। আগের আইনের তুলনায় এই শাস্তির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ধারা ১০ক অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার মাঠ এবং শিশুদের বিনোদনকেন্দ্রের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বা ইলেকট্রনিক নিকোটিন সরবরাহকারী যন্ত্র, যেমন ই-সিগারেট বিক্রি করা নিষিদ্ধ। এই বিধান অমান্য করলে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার মুখে পড়তে হবে। পূর্বের আইনে এই দূরত্ব ১০০ গজ ছিল, যা সংশোধিত আইনে ১০০ মিটার করা হয়েছে।
আইনের ধারা ১০গ-তে তামাকজাত পণ্য বিক্রির জন্য লাইসেন্স বা নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়া তামাক পণ্য বিক্রি করলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা যাবে। একই অপরাধ পুনরায় ঘটলে জরিমানার পরিমাণ দ্বিগুণ হবে। ফলে আদালত প্রাঙ্গণে অনুমতিহীন বা ভ্রাম্যমাণ তামাক বিক্রেতাদের কার্যক্রমও আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
নতুন সংশোধনীতে ই-সিগারেট, ভেপিং ডিভাইস এবং হিটেড টোব্যাকো পণ্যের মতো আধুনিক তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, সংরক্ষণ, প্রচার, বিজ্ঞাপন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়ে এসব পণ্য ব্যবহার করলেও সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
আদালত চত্বরে যেন তামাকপণ্যের উন্মুক্ত বাজার:
আদালত চত্বরে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, আদালত প্রাঙ্গণের একাধিক স্থানে প্রকাশ্যে চলছে সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের বিক্রি। অনেক ক্ষেত্রে অস্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা আদালতের কার্যক্রম চলাকালীন পুরো সময়ই ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত চত্বরে তামাকপণ্যের বিক্রি সবচেয়ে দৃশ্যমান। আদালতের চতুর্থ ও পঞ্চম তলাকে সংযুক্ত করা সেতুতে নিয়মিত দুই ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাকে সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য বিক্রি করতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে হাজতখানার আশপাশেও আরও দুই বিক্রেতা মাটিতে বসে প্রকাশ্যে ব্যবসা করছেন। এ ছাড়া আদালত ভবনের বিভিন্ন অংশে ঘুরে ঘুরে আগত মানুষদের কাছে তামাকপণ্য বিক্রি করতে দেখা গেছে কয়েকজন বিক্রেতাকে।
ঢাকা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরের অবস্থাও ভিন্ন নয়। সেখানে অন্তত তিনটি স্থানে তামাকজাত পণ্যের বেচাকেনা চলছে। প্রধান ফটকের পাশে জায়গা দখল করে বসেছেন দুই চা ও সিগারেট বিক্রেতা। অন্যদিকে ভবনের সিঁড়ির সামনেও একজন বিক্রেতাকে নিয়মিত ব্যবসা করতে দেখা গেছে। ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পেছনের সীমানা প্রাচীরের ভেতরেও একজন বিক্রেতা দীর্ঘদিন ধরে সিগারেট বিক্রি করছেন বলে দেখা গেছে।
এদিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সামনের ক্যান্টিনসংলগ্ন এলাকাতেও দুই বিক্রেতা প্রকাশ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রি করছেন। আদালত-সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব বিক্রেতার অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে একই স্থানে ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। ফলে আদালত প্রাঙ্গণের বিভিন্ন অংশ কার্যত তামাকপণ্যের উন্মুক্ত বিক্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
‘আইনের প্রাঙ্গণেই ধোঁয়ার যন্ত্রণায় মানুষ’:
আদালত প্রাঙ্গণে তামাকজাত ধোঁয়া ও প্রকাশ্যে ধূমপানের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টরা। আইনের প্রয়োগের জায়গাতেই এমন পরিস্থিতি নিয়ে তারা প্রকাশ করেছেন তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা।
জমিসংক্রান্ত মামলার কাজে নিয়মিত আদালতে আসা বিচারপ্রার্থী মোসাম্মৎ ফরিদা বেগম বলেন, ভিড়ের মধ্যে চারপাশ থেকে আসা সিগারেটের ধোঁয়ায় তার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তিনি বলেন, তিনি নিজেই অ্যাজমার রোগী। তার ভাষায়, “আইনের জায়গায় এসে যদি এভাবে বেআইনি ধোঁয়ার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?”
ঢাকা আইনজীবী সমিতির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ কে এম মাহফুজুর রহমান আদালত প্রাঙ্গণের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আদালত একটি মর্যাদাপূর্ণ ও পবিত্র স্থান। কিন্তু বারান্দা, সিঁড়ি ও সংযোগ সেতুতে প্রকাশ্যে ধূমপান আদালতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। তিনি এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানান।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম, যিনি সাক্ষী হিসেবে আদালতে এসেছিলেন, তিনি জানান যে সিএমএম আদালতের পঞ্চম তলার সংযোগ সেতুতে গিয়ে তিনি বিস্মিত হন। সেখানে প্রকাশ্যে সিগারেট বিক্রি ও ধূমপানের দৃশ্য দেখেন। তার ভাষায়, পুলিশ সদস্যরা পাশ দিয়েই চলাচল করলেও কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। তিনি এটিকে সরাসরি আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট নুসরাত জাহান রিমি বলেন, আদালত প্রাঙ্গণের পরিবেশ নারীদের জন্য আরও বেশি অস্বস্তিকর ও দমবন্ধকর। তার মতে, বসার জায়গার সংকটের পাশাপাশি চারপাশে ধূমপানের কারণে নারী ও শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন, যা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি এটিকে মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলেও মন্তব্য করেন।
আদালতের পেশকার মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, কাজের চাপের মধ্যেও বারান্দায় বের হলে সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য করতে হয়, যা কাজের মানসিকতাকে প্রভাবিত করে। তিনি আদালত প্রাঙ্গণে এসব অবৈধ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
আদালত প্রাঙ্গণে তামাক বিক্রেতাদের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছেন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হাজতখানার আশপাশ ও আদালত চত্বরে সবসময়ই মানুষের ভিড় থাকে। ফলে কে কখন ধূমপান করছে, তা সবসময় নজরে রাখা সম্ভব হয় না। তবে ভ্রাম্যমাণ দোকান উচ্ছেদ করা হলেও কিছুদিন পর তারা আবার একই স্থানে ফিরে আসে বলে তিনি জানান।
পরোক্ষ ধূমপানে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি:
চিকিৎসকদের মতে, প্রকাশ্য ধূমপানের ফলে বাতাসে নিকোটিনসহ নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ে। আদালতপাড়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও সীমিত বায়ু চলাচলের এলাকায় এসব ধোঁয়া দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। এতে সেখানে আসা মানুষজন পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন, যা ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া ফেলে দেওয়া সিগারেটের ফিল্টার ও অবশিষ্টাংশ আদালত চত্বরের পরিবেশও মারাত্মকভাবে দূষিত করছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আদালত চত্বরের সামনেই অবস্থিত ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। প্রতিদিন সেখানে শত শত রোগী ও তাদের স্বজন চিকিৎসা নিতে আসেন। পাশাপাশি মেডিকেল শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আদালত প্রাঙ্গণের ধূমপান ও তামাক ব্যবহার হাসপাতালমুখী মানুষদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করছেন অনেকে। আদালত চত্বরে সিগারেটের দোকান ও প্রকাশ্যে ধূমপানের দৃশ্য নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
ঢাকার এই এলাকায় রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আশপাশে অন্তত আরও ১০টির বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে আদালতপাড়ার অনিয়ন্ত্রিত তামাক বিক্রি ও ধূমপান শিক্ষার্থীদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, পরোক্ষ ধূমপান সরাসরি ধূমপানের মতোই ক্ষতিকর। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ধোঁয়া দীর্ঘসময় বাতাসে থেকে যায়, যা শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগীদের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তার মতে, হাসপাতালের সামনে এমন পরিবেশ জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সায়মা রহমান বলেন, আদালতপাড়ার আশপাশে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় তরুণদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। প্রকাশ্যে ধূমপান ও তামাক বিক্রি শিক্ষার্থীদের সামনে ভুল বার্তা দিচ্ছে। তিনি এ এলাকায় কঠোর আইন প্রয়োগ এবং কার্যকরভাবে ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
গতকাল ৩১ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয়েছে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’। এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘আকর্ষণের মুখোশ উন্মোচন: নিকোটিন ও তামাক আসক্তি মোকাবেলা’। তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর এই দিনে দেশের বিচার ব্যবস্থার কেন্দ্রস্থল আদালত প্রাঙ্গণকে ঘিরে আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইন বাস্তবায়নের বার্তা যেখানে প্রতিনিয়ত দেওয়া হয়, সেই আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার ও বিক্রি অনেকের কাছেই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীদের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে, আদালত চত্বরের ভেতরে থাকা তামাকজাত পণ্যের দোকানগুলো দ্রুত উচ্ছেদ করতে হবে। পাশাপাশি পুরো আদালতপাড়াকে কার্যকরভাবে ‘ধূমপানমুক্ত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
মাদকবিরোধী সংগঠন ‘প্রত্যাশা’র সাধারণ সম্পাদক হেলাল আহমেদ বলেন, আদালতপাড়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধূমপানমুক্ত এলাকা ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই। তার ভাষায়, অনেক সিনিয়র আইনজীবী ও তাদের সহকারীদেরও প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখা যায়, যা আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা।
তিনি আরও বলেন, আদালত চত্বরের বিভিন্ন স্থানে পানের দোকান ও ছোট টং দোকান গড়ে উঠেছে, যেগুলোতে নিয়মবহির্ভূতভাবে সিগারেট বিক্রি করা হচ্ছে। সহজলভ্যতার কারণে মানুষ ধূমপানে আরও বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
হেলাল আহমেদ আরও অভিযোগ করেন, ঢাকা জেলা প্রশাসনের টাস্কফোর্স কমিটি থাকলেও সেটি কার্যকরভাবে কাজ করছে না। আইনজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই কমিটির নিয়মিত বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হয় না। অনেক সময় অল্প সময়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে সভা শেষ করা হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আদালতপাড়াকে সম্পূর্ণ ধূমপানমুক্ত করতে টাস্কফোর্স কমিটিকে আরও সক্রিয় করার আহ্বান জানান। তার মতে, কমিটি কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করলে আদালত প্রাঙ্গণকে তামাকমুক্ত করা অনেকটাই সম্ভব হবে।
পুলিশের সরাসরি জরিমানা করার ক্ষমতা নেই:
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান বলেন, প্রতিদিন আদালতপাড়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি থাকে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ৩০ হাজার আইনজীবী কাজ করেন। তাদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে আরও প্রায় ২০ হাজার মানুষ যুক্ত থাকেন। পাশাপাশি বিচারপ্রার্থী ও বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ মানুষ আদালত এলাকায় যাতায়াত করেন।
তিনি বলেন, ধূমপান নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পক্ষ থেকে মানুষকে নিরুৎসাহিত করা হয় এবং প্রকাশ্যে ধূমপান করলে তা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়। বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসকে কেন্দ্র করে এ বিষয়ে সচেতনতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে আদালত প্রাঙ্গণসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধূমপান নিয়ন্ত্রণে এখনো শতভাগ সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আশিস বিন হাছান আরও বলেন, ধূমপান একটি জনউপদ্রব, যা অধূমপায়ীদের জন্যও ক্ষতিকর। এ কারণে পুলিশ সদস্যদের জন্য ধূমপান কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। তিনি জানান, সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে দুই হাজার টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও পুলিশের সরাসরি জরিমানা করার ক্ষমতা নেই। এ ধরনের জরিমানা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়। তার মতে, আদালত প্রাঙ্গণ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অধীন এবং মহানগর এলাকায় নিয়োজিত বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেটরা জনউপদ্রব বা যানবাহনসংক্রান্ত ঘটনায় তাৎক্ষণিক জরিমানা করার ক্ষমতা রাখেন।
তিনি আরও বলেন, ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রয়োগই নয়, মানুষের আচরণগত পরিবর্তন ও সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। তার মতে, আইনগত ব্যবস্থা ও সামাজিক সচেতনতা একসঙ্গে কার্যকর হলে আদালত প্রাঙ্গণসহ জনসমাগমস্থলগুলো ধূমপানমুক্ত করা সম্ভব হবে।
এদিকে আদালত প্রাঙ্গণে ধূমপান নিয়ন্ত্রণ, তামাকবিরোধী আইন বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জ নিয়ে মন্তব্য জানতে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিভি/এম

