তীব্র আর্থিক সংকট ও লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন-এ নজিরবিহীন ‘মাসোহারা’ আদায় ও কোটি টাকার ‘পদবাণিজ্য’ চালানোর অভিযোগ উঠেছে। দেশের ২২টি ডিপো ও ট্রেনিং সেন্টার থেকে প্রতি মাসে অন্তত ১ কোটি ৮৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার অবৈধ চাঁদা তোলা হচ্ছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মোল্লা ও তার ঘনিষ্ঠ কিছু শীর্ষ কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই চক্রই এসব অর্থ আদায় ও আত্মসাৎ করছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সংস্থার চার্টার অব ডিউটিজ ও অর্গানোগ্রাম উপেক্ষা করে এবং জ্যেষ্ঠতার নিয়ম ভেঙে অযোগ্য ব্যক্তিদের ডিপো প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কারিগরি ও অপারেশনস বিষয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে সাধারণ বিভাগ থেকে পছন্দের লোকদের পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকর্তার অনেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রয়েছে এবং তাদের মধ্যে গুরুতর ফৌজদারি মামলার আসামিও আছেন বলে নথিতে উল্লেখ পাওয়া গেছে।
অভ্যন্তরীণ অভিযোগে বলা হয়, চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন্স) মো. রাহেনুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত উপ-মহাব্যবস্থাপক (ওয়ার্কস) মো. মনিরুজ্জামান মিয়া, জোয়ারসাহারা ডিপোর ইউনিট প্রধান মো. মফিজ উদ্দিন এবং গাবতলী ডিপোর ইউনিট প্রধান মো. নায়েব আলী।
এদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের কারণে সংস্থার নিট মুনাফা কমে যাচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ সচিবের দপ্তরে জমা হয়েছে। অন্যদিকে সংস্থার ভেতরে অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। বিভিন্ন ডিপোর তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগপত্রে আয়-ব্যয়ের অসঙ্গতি, বদলি বাণিজ্য এবং নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে।
বরিশাল বিভাগীয় রুটের একটি হিসাব অনুযায়ী, সেখানে প্রতিদিন ৩৬টি বাস চলাচল করে। এসব বাস থেকে প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ৩৬ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০ কর্মদিবস ধরে হিসাব করলে শুধু বরিশাল ডিপো থেকেই মাসে প্রায় ৭ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো থেকে ৩০ লাখ, ঢাকা ট্রাক ডিপো থেকে ২৫ লাখ, মতিঝিল ও রংপুর বাস ডিপো থেকে ১০ লাখ করে এবং জোয়ারসাহারা ডিপো থেকে ৮ লাখ টাকা করে মাসে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশের প্রায় সব ডিপো ও ট্রেনিং সেন্টার থেকে প্রতি মাসে মোট ১ কোটি ৮৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে।
অভ্যন্তরীণ নথি ও তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব অর্থের একটি অংশ প্রধান কার্যালয়ে ‘মাসোহারা’ হিসেবে পাঠানো হয়। যদিও সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। চট্টগ্রামের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাকে আর্থিক ও মানসিকভাবে হয়রানি করা হয়েছে।
একাধিক ডিপোর কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগে জানা গেছে, মাসোহারা আদায়ের বিষয়টি চাপের মধ্যে স্বীকার করেছেন কেউ কেউ। চট্টগ্রাম বিভাগের একটি ডিপোর ব্যবস্থাপক জানান, বাস না থাকায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে, তারপরও মাসোহারা পাঠানোর চাপ দেওয়া হচ্ছে। বরিশালের এক কর্মকর্তা জানান, মেরামত ও জ্বালানি সংকটে আয় কমে গেছে, ফলে চাকরি চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের ডিপো ম্যানেজারদের কাছ থেকে সংগৃহীত অবৈধ অর্থের বড় অংশ দিয়ে প্রধান কার্যালয়ের কিছু শীর্ষ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত খরচ, বাজার এবং আত্মীয়স্বজনের বাসার আসবাবপত্র পর্যন্ত কিনতে বাধ্য করা হয়।
অর্থ দিলেই খুলছে পদোন্নতির দরজা:
রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন-এ ‘চার্টার অব ডিউটিজ’ ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্গানোগ্রাম উপেক্ষা করে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে পছন্দের কর্মকর্তাদের ডিপো প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যানদের ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের নীতিমালায় বলা আছে, অপারেশন্স বিভাগের ব্যবস্থাপকরা ইউনিট প্রধানের দায়িত্ব পাবেন। এই পদের ফিডার হিসেবে রয়েছে ট্রান্সপোর্ট কর্মকর্তা (ট্রাফিক অফিসার) এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এই নিয়ম উপেক্ষা করে ভিন্ন ট্রেডের কর্মকর্তাদের ডিপো প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিআরটিসির প্রবিধানমালায় আরও বলা আছে, করপোরেশনের স্বার্থে চেয়ারম্যান প্রয়োজন মনে করলে যেকোনো কর্মকর্তাকে ইউনিট প্রধানের দায়িত্ব দিতে পারেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, এই বিধানের অপব্যবহার করে স্বার্থের পরিবর্তে অনৈতিক সুবিধাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
ফলে বর্তমানে ট্রান্সপোর্ট ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বাইরে টেকনিক্যাল, ইনস্ট্রাক্টর, স্টোর অফিসার এবং হিসাবরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তারাও ইউনিট প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব কর্মকর্তার অনেকেরই ডিপো পরিচালনার ন্যূনতম অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতা না থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, বিআরটিসির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সবকিছুই ভুয়া এবং ভিত্তিহীন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রশ্ন করা হচ্ছে। পরে তার কার্যালয়ে সাক্ষাতের অনুরোধ করা হলে তিনি কোনো সাড়া দেননি।
এদিকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) ড. জিন্নাত রেহানা জানান, বিআরটিসি নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগগুলো বিভাগীয় সভায় আলোচনা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন।
তিনি বলেন, চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোও তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং সচিবও বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, সড়ক বিভাগের সব প্রতিষ্ঠানকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে। কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে তা দ্রুত বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

