সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, এরপর সরাসরি সাক্ষাৎ, তারপর এনক্রিপ্টেড অ্যাপে নতুন এক পরিচয়ে অন্তর্ভুক্তি—পড়াশোনা ও পরিবার ছেড়ে দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয় তাকে, নিয়ে যাওয়া হয় একের পর এক গোপন আস্তানায়। সেখানে তথাকথিত ধর্মীয় শিক্ষার আড়ালে শুরু হয় বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ। কয়েক বছরের ব্যবধানে একজন সাধারণ কলেজপড়ুয়া তরুণ পরিণত হন জঙ্গি সংগঠনের অন্যতম বোমা প্রস্তুতকারীতে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার একটি নথিতে এমনই এক চাঞ্চল্যকর বিবরণ পাওয়া গেছে।
আলোচিত এই তরুণের নাম নাজমুল হাসান মামুন, যিনি পরিচিত ‘বোমারু মামুন’ নামে। বরিশালের রূপাতলীর বাসিন্দা মামুন ২০১৪ সালে এসএসসি পাস করার পর ঢাকার উত্তরার একটি কলেজে ভর্তি হন, তবে ২০১৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হন।
গোয়েন্দা নথি অনুযায়ী, দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় ফেসবুকে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে প্রথম তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়। শুরুতে ধর্মীয় বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও পাঠিয়ে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করা হয়, যা ধীরে ধীরে রূপ নেয় উগ্রপন্থার প্রতি আহ্বানে।
২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে উত্তরার একটি পার্কে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন মামুন ও তাঁকে যোগাযোগ করা ব্যক্তি। এরপর থেকে কথোপকথনের ধরন বদলাতে থাকে—সাধারণ ধর্মীয় আলাপের সঙ্গে যুক্ত হয় পড়াশোনা, পরিবার ও প্রচলিত জীবনযাত্রা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা। তাঁকে বোঝানো হতে থাকে, জাগতিক শিক্ষা বা পারিবারিক জীবনের কোনো মূল্য নেই।
এই যোগাযোগ পরে সীমাবদ্ধ থাকেনি সাধারণ ফেসবুকে। মামুনের ফোনে একটি সুরক্ষিত মেসেজিং অ্যাপ ইনস্টল করানো হয় এবং তাঁকে একটি নতুন সাংগঠনিক পরিচয় দেওয়া হয়। এরপর তাঁকে সংগঠনের আরেকজন দায়িত্বশীল সদস্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
২০১৬ সালের অক্টোবরের শেষদিকে মামুনকে বাসা ছাড়তে বলা হয় এবং তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রামের একটি গোপন আস্তানায়, যেখানে আরও কয়েকজন তরুণের সঙ্গে কড়া নজরদারির মধ্যে রাখা হতো তাঁকে। সেখানে তাঁদের উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শের পাঠ দেওয়া হতো।
প্রায় দেড় মাস পর তাঁকে আরেকটি আস্তানায় সরিয়ে নেওয়া হয়, যেখান থেকেই মূলত শুরু হয় তাঁর বিস্ফোরক-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ। এরপর ধারাবাহিকভাবে সিলেট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ঝিনাইদহের বিভিন্ন আস্তানায় তাঁকে নেওয়া হয়, যেখানে সংগঠনের প্রশিক্ষকদের কাছে তিনি ক্রমান্বয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। একপর্যায়ে তিনি নিজেই অন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন এবং সংগঠনের বিভিন্ন সদস্যের কাছে বিস্ফোরক সরবরাহের দায়িত্বও পালন করতে থাকেন।
রাজধানীর পান্থপথের একটি হোটেলে ২০১৭ সালে সংঘটিত আত্মঘাতী হামলায় ব্যবহৃত বিস্ফোরকের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে মামুন গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘদিন কারাগারে থাকেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তিনি জামিনে মুক্তি পান এবং চলতি বছরের শুরুতে সংশ্লিষ্ট মামলা থেকে সম্পূর্ণভাবে খালাসও পান। মুক্তির পর তিনি নিজেকে নির্দোষ ভুক্তভোগী দাবি করে গুম-সংক্রান্ত একটি তদন্ত কমিশনে লিখিত অভিযোগও দাখিল করেন, যেখানে নিজেকে গুমের শিকার বলে দাবি করেন।
তবে গোয়েন্দা তথ্য বলছে, কারাগার থেকে বেরিয়ে নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করলেও মামুন প্রকৃতপক্ষে আবার সক্রিয়ভাবে জঙ্গি সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত হন। বর্তমানে তাঁর নেটওয়ার্ক একটি সুরক্ষিত এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে বলে শনাক্ত করেছেন গোয়েন্দারা। নজরদারি এড়াতে সাধারণ যোগাযোগমাধ্যমের বদলে এখন তুলনামূলক নিরাপদ এনক্রিপ্টেড অ্যাপগুলোর দিকে ঝুঁকছে এ ধরনের উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক বলেও উল্লেখ করা হয়েছে নথিতে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন সক্রিয়ভাবে মামুনকে খুঁজছে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট জানিয়েছে, সাভারে একটি আস্তানা থেকে একাধিক পাইপ বোমা উদ্ধারের সূত্র ধরেই মূলত মামুনের সাম্প্রতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসে এবং তাঁকে গ্রেপ্তারে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

