Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice শুক্র, জুলাই 3, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • বিশ্লেষণ
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » সন্ত্রাসীদের কবলে বন্দি যে শহর
    অপরাধ

    সন্ত্রাসীদের কবলে বন্দি যে শহর

    মনিরুজ্জামানজুন 5, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    খুলনা নগরের প্রাণকেন্দ্র ডাকবাংলো মোড়। দিনের বেশির ভাগ সময়ই এই এলাকা থাকে মানুষের ভিড় আর ব্যস্ততায় সরগরম। সেই জনবহুল স্থানেই গত ৪ মার্চ ঘটে যায় এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড। রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহকে প্রকাশ্যে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার সময় আশপাশে থাকা মানুষ আতঙ্কে থাকলেও হামলাকারীরা নির্বিঘ্নে সেখান থেকে চলে যায়।

    শুধু এই একটি ঘটনা নয়। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই খুলনায় প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে হত্যা ও গুরুতর জখমের এমন অন্তত অর্ধশত আলোচিত ঘটনা ঘটেছে। আর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ২২ মাসে খুলনা শহর ও জেলায় এমন ঘটনার সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়েছে বলে স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়।

    স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজির দখলদারি, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পুরোনো শত্রুতা।

    সর্বশেষ হত্যাকাণ্ড ঘটে ২ জুন নগরের লবণচরা থানার সাচিবুনিয়া স্কুলভিটা এলাকায়। ওই দিন দুপুর ১২টার দিকে কাজী রাশিদুল ইসলাম নামের এক যুবককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ব্যক্তিগত বিরোধের ফল বলে ধারণা করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, এতে জড়িত ব্যক্তি একটি আলোচিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্য। একই সঙ্গে দাবি করা হচ্ছে, তিনি আড়াই মাস আগে নিহত যুবকের পরিবারের সদস্যদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনাতেও জড়িত ছিলেন। এর আগে ডাকবাংলো মোড়ের ঘটনায় প্রাণ বাঁচাতে মাসুম বিল্লাহ একটি শোরুমে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেই তাঁকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

    স্থানীয়দের অভিযোগ, খুলনার অপরাধ জগতের অধিকাংশ ঘটনায় ঘুরেফিরে আটটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম সামনে আসে। এসব গোষ্ঠী এখন এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে জনবহুল এলাকাতেও প্রকাশ্যে হামলা চালাতে তারা দ্বিধা করছে না। আতঙ্কের কারণে সাধারণ মানুষও তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বা প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না।

    আরও অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও অদক্ষতার সুযোগেই এসব গোষ্ঠী আরও শক্তিশালী হয়েছে। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে তালিকা অনুযায়ী অভিযান, গ্রেপ্তার এবং কিছু মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটনের কথা জানানো হয়, তবু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল পরিকল্পনাকারীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের নতুন পটভূমি তৈরি হচ্ছে।

    খুলনায় বাড়ছে হত্যাকাণ্ড:

    খুলনায় খুনের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে খুলনা মহানগরীতে হত্যার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। খুলনা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে মহানগরে খুনের ঘটনা ঘটে ১৫টি। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯টি, ২০২৩ সালে ১৭টি। এরপর ২০২৪ সালে সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ২৯টি এবং ২০২৫ সালে তা আরও বেড়ে ৩৪টিতে পৌঁছে। চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পাঁচ মাসেই খুন হয়েছে ১৬টি।

    মহানগরের বাইরেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। খুলনা জেলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে খুনের মামলা হয় ৩০টি। ২০২২ সালে তা কমে ২২টি হলেও ২০২৩ সালে ২১টি থাকে। এরপর ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩১টি, ২০২৫ সালে তা লাফিয়ে ৪৯টিতে পৌঁছে। আর ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে মামলা হয়েছে ২০টি।

    ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পরও খুনোখুনির ঘটনা থামেনি বলে পরিসংখ্যানে দেখা যায়। ফেব্রুয়ারিতে খুলনা শহরে খুন হয় ৪টি, মার্চে ৪টি, এপ্রিলে ২টি এবং মে মাসে ৫টি ঘটনা ঘটে। একই সময়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনাও সামনে আসে। ২১ মে বটিয়াঘাটা উপজেলার পুঁটিমারী বাজারে জলমা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি কার্যালয়ে ঢুকে গুলিবর্ষণের ঘটনায় যুবদলের দুই কর্মী আহত হন।

    খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ‘ভঙ্গুর’ বলে মন্তব্য করেন মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম (মনা)। তিনি বলেন, মানুষের নিরাপত্তা নেই। প্রকাশ্যে খুন, যেকোনো সময় হামলা, গুলিবর্ষণ ও চাঁদাবাজি চলছে। এসব অবিলম্বে বন্ধ করা জরুরি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, খুলনায় কিশোর গ্যাং ও মাদক সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিষয়টি একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় জানানো হলেও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।

    পুলিশের সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ ও এপ্রিলে দেশের আটটি মহানগর পুলিশের ইউনিটের মধ্যে খুলনা মহানগরে ১৫ ধরনের অপরাধে সবচেয়ে কম মামলা হয়েছে। মার্চে মামলা হয় ১০৫টি এবং এপ্রিলে ১১৪টি। তবে স্থানীয়দের মতে, এই পরিসংখ্যান প্রকৃত চিত্র নয়। তাঁদের দাবি, ভয় ও আতঙ্কের কারণে অনেক ঘটনায় মামলা হয় না, ফলে বাস্তব অপরাধ অনেকটাই আড়ালেই থেকে যায়।

    একটি ঘটনার পর আবারও নীরবতার চিত্র দেখা যায় মাঠপর্যায়ে। মাসুম বিল্লাহ হত্যার দুই মাস পর গত ১৩ মে ঘটনাস্থলের জুতার দোকানে গেলে তিন কর্মীকে পাওয়া যায়, যারা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অনিচ্ছুক। দোকানের ব্যবস্থাপক দীপঙ্কর বাহাদুর প্রথমে বলেন, তিনি কিছুই দেখেননি, যদিও সিসিটিভি ফুটেজে তাঁর সামনেই ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। পরে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি সংক্ষেপে বলেন, “এ বিষয়ে কথা বলা নিষেধ।

    আদালত চত্বরেও নিরাপত্তাহীনতা:

    খুলনায় প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শুধু জনবহুল এলাকা বা মহাসড়কেই সীমাবদ্ধ নয়, আদালতপাড়াতেও ঘটছে ভয়াবহ সহিংসতা। মাসুম বিল্লাহ হত্যাকাণ্ডের তিন মাস আগে খুলনা জেলা জজ আদালতের প্রধান ফটকের সামনে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজন নামের দুই ব্যক্তিকে। তাঁরা তখন আদালতে মামলার হাজিরা দিয়ে বের হচ্ছিলেন।

    এই ঘটনার পর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে—জনসমাগমপূর্ণ আদালতপাড়ায় যদি এমন হত্যাকাণ্ড ঘটে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? স্থানীয়দের মতে, ডাকবাংলো মোড় থেকে শুরু করে আদালতপাড়া—সব জায়গার ঘটনাই দেখাচ্ছে, প্রশাসন জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। খুলনা জেলা জজ আদালতের প্রধান ফটকের বাইরে ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।

    এ বিষয়ে খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, শহরের অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। খবর পেলেই পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেও তিনি জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের কারও কারও অতীতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

    সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর প্রকাশ্য প্রচারণা ও চেহারা দেখিয়ে ভয় দেখানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কেএমপি কমিশনার স্বীকার করেন, পুলিশের সক্ষমতায় কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, পুলিশের একটি অংশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের তথ্য ফাঁস করা বা যোগাযোগ রাখার অভিযোগ থাকলেও তা পুরোপুরি সত্য নয়।

    ‘ভাই, আমাকে জানে মাইরেন না’—খুলনার ভয়াবহতা:

    খুলনায় সন্ত্রাসী হামলা ও প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের এমন এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে, যেখানে আর্তচিৎকারও রক্ষা করতে পারেনি জীবন। গত ৮ মে চারটি মোটরসাইকেলে করে আসা সন্ত্রাসীরা আজিজুল ইসলাম নামের এক যুবককে সাচিবুনিয়া বাজার থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাঁকে রাঙ্গেমারীর ভেতরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এলাকাটি খুলনা নগরের জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় সোয়া চার কিলোমিটার দূরে, যা বটিয়াঘাটা, লবণচরা ও হরিণটানা থানার সীমান্তবর্তী এলাকা।

    ১১ মে ওই ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয়দের মধ্যে এখনও গভীর আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট ছিল। কেউই প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। তবে দূর থেকে ঘটনার দিন আজিজুলের আর্তচিৎকার শুনেছেন বলে জানান তিনজন স্থানীয় বাসিন্দা।

    তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে আজিজুল বারবার অনুরোধ করছিলেন, ‘ভাই, আমাকে জানে মাইরো না। আমার ছোট ছোট দুইটা বাচ্চা আছে। আমি কিছু করি নাই।’ মাত্র দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যেই তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর সন্ত্রাসীরা চলে যাওয়ার সময় দুটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে।

    নিহত আজিজুল খুলনা টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট সংলগ্ন রূপা পেট্রলপাম্পের পাশের একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। বাড়ির মালিক ফিরোজ আলম জানান, আজিজুল পেঁয়াজ-রসুনের ব্যবসা করতেন এবং ফুটপাতে বসে বিক্রি করতেন। হত্যার পর তাঁর স্ত্রী সীমা আক্তার দুই সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

    সীমা আক্তার  বলেন, তাঁর স্বামী পুরোনো লোকজন থেকে দূরে সরে এসে ব্যবসা ও পরিবার নিয়েই জীবন চালাতেন। কিন্তু সেই জীবনও শেষ হয়ে যায় নির্মমভাবে। আজিজুলের শ্বশুর শেখ মুকুল হোসেন অভিযোগ করেন, ঘটনার পরও পুলিশ তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। এখন তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছেন।

    পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আজিজুলের বিরুদ্ধে ডাকাতি ও হত্যাসহ সাতটি মামলা ছিল। ২০১৭-১৮ সালের দিকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তিনি একটি পা হারান। তবে স্থানীয়দের একটি অংশ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অতীতের মামলা দিয়ে এমন হত্যাকাণ্ডের ন্যায্যতা দেওয়া যায় না। তাদের মতে, এই ঘটনা দেখায়—অপরাধ জগত থেকে বেরিয়ে আসার পরও খুলনায় প্রতিশোধের ঝুঁকি থেকে কেউ নিরাপদ নয়।

    এ ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে ৪ মে। রাজু হাওলাদার (৩৮) নামের গুলিবিদ্ধ এক ব্যক্তিকে ঢাকায় নেওয়ার পথে রূপসার কুদির বটতলা এলাকায় অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই গুলি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, এটিও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল। রাজুর বিরুদ্ধেও হত্যা ও ডাকাতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে এবং লবণচরা থানায় তাঁর বিরুদ্ধে চারটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে।

    খুলনায় ৯ সন্ত্রাসী গ্রুপের প্রভাব:

    খুলনা মহানগর ও জেলায় সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে খোঁজখবর রাখা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে—এমন আটজন এবং এখনো যোগাযোগ রয়েছে—এমন তিনজনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

    প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগর ও জেলায় বর্তমানে অন্তত ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে। এসব গ্রুপের মধ্যে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর ‘বি-কোম্পানি’, শেখ পলাশের ‘পলাশ গ্রুপ’, হুমায়ুন কবীরের ‘হুমা বাহিনী’, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের ‘আরমান গ্রুপ’, শাকিল শেখের ‘শাকিল গ্রুপ’ এবং নাসিমুল গণির ‘নাসিম গ্রুপ’। এসব সংগঠনের বাইরে দিঘলিয়া, আড়ংঘাটা, কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ এলাকায় আরও ছোট ছোট অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে জানা যায়।

    স্থানীয় সূত্রগুলোর মতে, এই গ্রুপগুলোর কার্যক্রম একধরনের সমান নয়। কিছু গ্রুপ সরাসরি মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কিছু আবার স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, জমি, ঘের, ঘাট, পরিবহন ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সক্রিয়। এছাড়া দৌলতপুর ও মহেশ্বরপাশা এলাকায় পুরোনো চরমপন্থী ধারার সন্ত্রাসীদের কিছু উত্তরসূরির অস্তিত্বও রয়েছে বলে দাবি করা হয়।

    দাউদ ইব্রাহিমের অনুকরণে ‘বি-কোম্পানি’:

    খুলনার অপরাধ জগতে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত নাম রনি চৌধুরী ওরফে বাবু, যিনি ‘গ্রেনেড বাবু’ নামেও পরিচিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, ২০০৪ সালে তৎকালীন খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমানের গাড়িতে গ্রেনেড হামলার পর থেকেই তাঁর নামের সঙ্গে ‘গ্রেনেড’ শব্দটি যুক্ত হয়ে যায়।

    বর্তমানে তিনি পরিচালিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম ‘বি-কোম্পানি’। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মুম্বাইভিত্তিক অপরাধ জগতের কুখ্যাত ‘ডি-কোম্পানি’র অনুকরণে এই নামকরণ করা হয়েছে। অনেকের মতে, তিনি নিজেকে ‘নবাব’ নামেও পরিচয় দেন এবং বর্তমানে বিদেশে বসে দল পরিচালনা করছেন।

    আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে খুলনায় ঘটে যাওয়া খুন, চাঁদাবাজি, দখল, সন্ত্রাস ও মাদক নিয়ন্ত্রণের বড় অংশেই গ্রেনেড বাবুর অনুসারীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। খুলনা মহানগরের বিভিন্ন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মারধরসহ অন্তত ১৭টি মামলার তথ্য রয়েছে। স্থানীয় ও নিরাপত্তা সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ‘বি-কোম্পানি’ একক কোনো দল নয়, বরং স্তরভিত্তিক একটি অপরাধ নেটওয়ার্ক। এতে কয়েক শ সদস্য কাজ করে, যাদের বড় অংশই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলে জানা যায়।

    এই কাঠামোর ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন স্তর। নিচের স্তরে কিশোর গ্যাং ও সাধারণ সদস্যরা কাজ করে। তাদের ওপরে থাকে শুটার, মোটরসাইকেল বাহিনী, মাদক বিক্রেতা, তথ্যদাতা ও সামাজিক প্রচারণাকারী। আর শীর্ষে থাকে নেতৃত্ব, সেকেন্ড ইন কমান্ড ও অর্থ নিয়ন্ত্রণকারী ‘ক্যাশিয়ার’ পর্যায়ের লোকজন।

    স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই নেটওয়ার্কের কিছু সদস্যকে মাসিক ৭ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। কাউকে মোটরসাইকেল, কাউকে অস্ত্র দেওয়া হয়। আবার কর্মহীন তরুণ ও কিশোরদের মাদক বিক্রির কাজে ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

    গত বছরের ৭ জুন যৌথ বাহিনী গ্রেনেড বাবুর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র, গুলি, নগদ অর্থ ও নথি উদ্ধার করে। তবে ওই সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আত্মগোপনে থেকে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে দল পরিচালনা করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি, অর্থসংক্রান্ত সমস্যা কিংবা আধিপত্যের দ্বন্দ্ব মেটাতেও এখন অনেকেই ‘বি-কোম্পানি’র শরণাপন্ন হন বলে শোনা যায়। শামসুর রহমান রোড, শেখপাড়া, আদালতপাড়া ও ডাকবাংলো এলাকার বিভিন্ন অংশে এই গোষ্ঠীর প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি। তবে সময়ের সঙ্গে তাদের প্রভাব খুলনার আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানানো হয়।

    অস্ত্র ও ভাড়াটে খুনে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক:

    খুলনার অপরাধ জগতের সদস্যরা এখন শুধু স্থানীয় এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, তারা ঢাকা, গাজীপুর ও সাভারের মতো এলাকাতেও গিয়ে ভাড়ায় খাটছে। টাকার বিনিময়ে খুন, হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে—এমন তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।

    ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তদন্তে দেখা যায়, গত মার্চে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় রাকিবুল ইসলাম হত্যার ঘটনায় খুলনার সন্ত্রাসীদের ভাড়া করা হয়েছিল। ডিএমপির রমনা বিভাগের তৎকালীন উপকমিশনার মাসুদ আলম  বলেন, ওই ঘটনায় ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল ঘটনাস্থলে আসে, যারা খুলনার ‘বি-কোম্পানি’ গ্রুপের সদস্য।

    তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই চক্রের সদস্যরা মূলত ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে কাজ করে। অর্থের বিনিময়ে নির্দেশ পেলেই তারা হামলা বা হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। এর আগেও এমন একাধিক ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে বলে তিনি জানান।

    অস্ত্রের বিস্তার ও উদ্ধার অভিযান:

    সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, খুলনায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সীমান্তপথে আসা অস্ত্র এখন খুলনা হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। খুলনা মহানগর পুলিশ (কেএমপি) ২০২৪ সালে ২৪টি এবং ২০২৫ সালে ৪৭টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৭টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে জেলা পুলিশ উদ্ধার করেছে আরও ১৪টি অস্ত্র।

    গত ৭ মার্চ রূপসা সেতুর টোল প্লাজা এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তল্লাশিতে সাতক্ষীরার এক নারীর কাছ থেকে ২টি রিভলবার, ৩টি পিস্তল, ৪টি ম্যাগাজিন ও ৯৬টি গুলি উদ্ধার করা হয়। কর্মকর্তারা জানান, তিনি অস্ত্রগুলো নিয়ে খুলনা হয়ে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। কেএমপির তালিকায় বর্তমানে ১৮১ জন সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এদের বড় অংশই অস্ত্রধারী।

    অভিযানের পরও থামছে না অপরাধ:

    সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলা সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা  বলেন, পুলিশ অনেক অপরাধীকে চিহ্নিত করলেও আগাম ব্যবস্থা নেয় না। তাঁর মতে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অপরাধ ঘটার পরই অভিযান শুরু হয়। স্থানীয়দের বড় অভিযোগ, অনেক সময় অভিযানের আগেই সন্ত্রাসীরা তথ্য পেয়ে যায়। পুলিশের ভেতরেও তাদের ‘ইনফরমার’ রয়েছে—এমন ধারণাও রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

    বিচারহীনতার আতঙ্ক ও নীরব সমাজ:

    অভিযান, গ্রেপ্তার ও মামলার পরও খুলনায় অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারীরা সহজে ধরা পড়ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবারও সক্রিয় হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মামলা করতেও ভয় পাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে আদালতে সাক্ষীও পাওয়া যাচ্ছে না।

    খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু  বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যে খুনোখুনির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা চরমপন্থীদের সময়েও ছিল না। তাঁর ভাষায়, প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটছে, চেহারাও চেনা যাচ্ছে, তবু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অপরাধীরা ধরা পড়ছে না।

    ডাকবাংলো মোড়ের ঐতিহ্যবাহী রহমানিয়া হোটেলের কর্মী মো. শহীদুল ইসলাম, যিনি ১৯৮৭ সাল থেকে সেখানে কাজ করছেন, বলেন—এরশাদ শিকদারের ফাঁসির পর খুলনায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পরিস্থিতি আবার ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, এখন মানুষ যে কোনো সময় গুলি ও কুপিয়ে হত্যার আতঙ্কে থাকে। তাঁর ভাষায়, “খুলনা এখন আতঙ্কের শহর।”

    সব মিলিয়ে খুলনায় শুধু অপরাধ নয়, তৈরি হয়েছে এক গভীর নীরবতার সংস্কৃতি। মানুষ জানে, কিন্তু বলে না। দেখে, কিন্তু সাক্ষ্য দেয় না। আর এই নীরবতার মধ্যেই অপরাধী নেটওয়ার্ক আরও সংগঠিত হয়ে নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা।

    সব মিলিয়ে খুলনার বাস্তবতা এখন শুধু পরিসংখ্যানের খাতায় সীমাবদ্ধ নেই। এখানে খুনের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে ভয়, নীরবতা আর অবিশ্বাসও। প্রকাশ্য রাস্তা, আদালতপাড়া কিংবা ব্যস্ত মোড়—কোথাও আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

    একদিকে অস্ত্র, মাদক আর ভাড়াটে খুনের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। কেউ কিছু দেখলেও বলতে চাইছে না, জানলেও সামনে আসছে না। এই নীরবতা এখন অপরাধের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে—এমনটাই বলছেন স্থানীয় বিশ্লেষকেরা।

    ফলে প্রশ্নটা আর শুধু কে খুন করল বা কেন করল—এখানে থেমে থাকছে না। প্রশ্নটা এখন অনেক গভীরে—একটি শহর কতদিন ভয়কে স্বাভাবিক মেনে চলতে পারে, আর নীরবতার এই শহরে নিরাপত্তা ফিরে আসবে কীভাবে? সূত্র: প্রথম আলো

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    অর্থনীতি

    যুক্তরাষ্ট্র-ভারতকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের শীর্ষ বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতা চীন

    জুলাই 3, 2026
    অপরাধ

    আরও শতাধিক নতুন কিশোর গ্যাংয়ের সন্ধান

    জুলাই 2, 2026
    অপরাধ

    ঢামেক থেকে ক্লিনিক—রোগীর আড়ালে গড়ে ওঠা অদৃশ্য সিন্ডিকেট

    জুলাই 2, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ইস্পাত শিল্প তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধের পথে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    নতুন বাণিজ্য কৌশলে আরসেপে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram
    ‘হাম ব্যবস্থাপনায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সমূহ কি পর্যাপ্ত ছিল, আপনি কি মনে করেন?

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsApp

    01339-517418

    Copyright © 2026 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.