সরকারের বিনা মূল্যের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ কার্যক্রমে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। ২০২৪ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ তদারকি, সম্মানী ভাতা প্রদান, রাজস্ব আদায় এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনিয়মের কারণে সরকারের প্রায় ১৮৩ কোটি ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের অধীন শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের পরিচালিত নিরীক্ষায় এসব তথ্য উঠে আসে। অনিয়মের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যানকে আধা সরকারি পত্র পাঠিয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। এনসিটিবি এসব আপত্তির জবাব দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ২৭ কোটি বই মুদ্রণ করা হয়। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরের জন্য ৫ কোটি ৩৮ লাখ এবং মাধ্যমিক স্তরের জন্য ২১ কোটি ৩৩ লাখ বই ছাপানো হয়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি মূলত মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই মুদ্রণের ব্যয় পর্যালোচনা করে তৈরি করা হয়েছে। এ খাতে মোট ব্যয় ছিল ৮৬৩ কোটি ১১ লাখ টাকা।
নিরীক্ষায় দেখা গেছে, বই উৎপাদন ও বিতরণ কার্যক্রমে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ চারটি সম্মানী ভাতা পাওয়ার পরও অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণ করেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং একটি প্রকল্পের কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘উদ্দীপনা ভাতা’ নামে ৯২ লাখ ৪৩ হাজার ২৩১ টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যদিও এ ধরনের ভাতার কোনো বিধান নেই। নিরীক্ষকরা এই অর্থ বোর্ডের তহবিলে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করেছেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি সম্মানী দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ কারণে সরকারের ৭৭ লাখ ৯৬ হাজার ৫০০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও দেখা গেছে, চেয়ারম্যানসহ এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত দাপ্তরিক কাজের জন্য ৭৬ লাখ ২৯ হাজার ২০ টাকা সম্মানী দেওয়া হয়েছে। অথচ নিয়মিত দায়িত্ব পালনের জন্য অতিরিক্ত সম্মানী গ্রহণের কোনো বিধান নেই বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বই মুদ্রণ তদারকির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ছাপাখানার কাজ পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়ে তাদের বিল পরিশোধ করা হলেও একই কাজের জন্য এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অতিরিক্ত ৬৪ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা তদারকি ভাতা দেওয়া হয়েছে। নিরীক্ষকদের মতে, এটি বিধিবহির্ভূত ব্যয়।
এ ছাড়া বই ছাপানোসংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটির সদস্যদের নির্ধারিত প্রাপ্যের বাইরে অতিরিক্ত হারে সম্মানী দেওয়া হয়েছে, যার পরিমাণ ৩১ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে বড় অনিয়ম হিসেবে উঠে এসেছে উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার বিষয়টি। নিরীক্ষা অনুযায়ী, অর্থবছর শেষে নির্ধারিত অংশ বোর্ডের তহবিলে রেখে অতিরিক্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দেওয়ায় সরকারের ১৬৭ কোটি ৫৫ লাখ ৮৫ হাজার ২৭৬ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। নিরীক্ষা ও হিসাবসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, বই মুদ্রণ কার্যক্রমে ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ১২ কোটির বেশি টাকা আদায় করা হয়নি। এর মধ্যে ভ্যাট আদায়ে ঘাটতির কারণে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৬ কোটি ৬৫ লাখ ৫০ হাজার ২৩৪ টাকা। আয়কর না কাটার কারণে ক্ষতির পরিমাণ ৫ কোটি ৩২ লাখ ৪০ হাজার ১৮৭ টাকা। পাশাপাশি সম্মানী বিল থেকে আয়কর কর্তন না করায় আরও ২৩ লাখ ৪২ হাজার ১০৫ টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। এসব অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু এ বিষয়ে বলেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অন্যদিকে, এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
দুর্নীতি পর্যবেক্ষণ সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিনা মূল্যের পাঠ্যপুস্তক কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ ধরনের অনিয়ম উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের সম্পৃক্ততাও নিশ্চিত করতে হবে।

