সীমান্ত পেরিয়ে অপরাধ দমনে সমন্বয়ের ভরসা এই আন্তর্জাতিক সংস্থা। বিশ্বের ১৯৬টি দেশ এর সদস্য। এর মূল দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভাঙা এবং বিভিন্ন দেশে পলাতক আসামিদের খুঁজে পেতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করা।
তবে ইন্টারপোল নিজে কোনো দেশের পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার মতো সরাসরি গ্রেফতার করতে পারে না। এটি মূলত সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়, সতর্কবার্তা জারি এবং সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করে।
গত রোববার (১৪ জুন) বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে গ্রেফতার হয়েছেন—এমন খবর সামনে আসতেই আবার আলোচনায় উঠে আসে ইন্টারপোলের ভূমিকা। দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলায় তার গ্রেফতার হওয়ার কথা জানানো হয়। পরে আমিরাত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠিও দেয়। এর পর থেকেই প্রশ্ন উঠছে—তিনি কবে, কীভাবে দেশে ফিরবেন এবং আদৌ প্রত্যর্পণ সম্ভব কি না। একই সঙ্গে সামনে আসছে ইন্টারপোলের মাধ্যমে আগেও যেসব আসামিকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে সফলভাবে আসামি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। যেমন, নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুনুর রশিদ খান হত্যা মামলার এক আসামি মহসিন মিয়াকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি দুবাই থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। একই মামলার আরেক আসামি আরিফ সরকারকে গত ৬ মে দুবাই থেকে ফিরিয়ে আনে পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা ও পুলিশ সদর দপ্তরের সমন্বিত একটি দল। পরে তাকে আদালতে হাজির করা হয়।
তবে সব ক্ষেত্রে ফল একই হয়নি। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি হওয়া মানেই প্রত্যর্পণ নিশ্চিত নয়। বর্তমানে ইন্টারপোলের তালিকায় প্রায় ৫৯ জন বাংলাদেশির নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী, হত্যা মামলার আসামি এবং ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মামলার পলাতক দণ্ডিত ব্যক্তিরাও আছেন। কিন্তু তাদের বড় অংশকে এখনও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আরাভ খান নামে পরিচিত রবিউল ইসলাম। পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক মামুন এমরান খান হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হয়েছিল। তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছিলেন। তবে পরে জানা যায়, তিনি ভারতীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করছিলেন। এ ধরনের বহুজাতিক পরিচয়ের কারণে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে আনা যায়নি।
আরেকটি আলোচিত নাম শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ। ২০১৯ সালে তাকে দুবাইয়ে গ্রেফতারের খবর এলেও পরে তার অবস্থান নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়। বিভিন্ন সূত্র জানায়, তিনি ভারতীয় ও ডমিনিকান প্রজাতন্ত্রের পাসপোর্ট ব্যবহার করছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব তথ্য থাকা সত্ত্বেও দুবাই পুলিশের কাছে তার নাগরিকত্ব নিয়ে নিশ্চিত প্রমাণ উপস্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তার প্রত্যর্পণও সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, জিসানের বিষয়ে বাংলাদেশের পুলিশের কাছে তথ্য থাকলেও দুবাই কর্তৃপক্ষ তার নাগরিকত্ব নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কিছু তথ্যও তখন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি, যা শেষ পর্যন্ত তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বেনজীর আহমেদকে ফিরিয়ে আনা কতটা সম্ভাবনাময়:
বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে গ্রেফতার হওয়ার খবর সামনে আসার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা কতটা সম্ভব। পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, গ্রেফতার হওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় অগ্রগতি হলেও প্রত্যর্পণের পথ মোটেও সহজ নয়।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এবং রেড অ্যালার্ট এক বিষয় নয়। রেড নোটিশের ভিত্তিতে কাউকে শনাক্ত বা আটক করা গেলেও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল। এটি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আদালতের সিদ্ধান্ত, মামলার নথির গ্রহণযোগ্যতা, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে প্রথমেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে পাঠাতে হয়। এর মধ্যে থাকে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা, এজাহার, অভিযোগপত্র বা তদন্তের সারসংক্ষেপ, আসামির পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ, প্রযোজ্য আইনের ধারা ও শাস্তির বিধান, আদালতের আদেশ এবং প্রত্যর্পণের আইনি ভিত্তি। এসব নথি সংশ্লিষ্ট দেশের গ্রহণযোগ্য ভাষায় অনুবাদ ও যথাযথভাবে প্রত্যয়ন করাও বাধ্যতামূলক।
নথিপত্র পাওয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ প্রথমে সেগুলো যাচাই করবে। এরপর বিষয়টি আদালতের বিবেচনায় যেতে পারে। আদালত তখন দেখবে, যে অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চাইছে, সেটি আমিরাতের আইনেও অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত কি না। এই আইনি নীতিকে বলা হয় ডুয়েল ক্রিমিনালিটি বা উভয় দেশের আইনে অপরাধ হওয়া। দুর্নীতি, জালিয়াতি, অর্থপাচার বা অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো অভিযোগ সাধারণত এই পরীক্ষায় তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকে।
তবে এখানেই শেষ নয়। আদালত আরও কিছু বিষয় বিবেচনা করতে পারে। যেমন অভিযোগটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, একই ঘটনার বিচার অন্য কোথাও হয়েছে কি না, মামলার সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে কি না, আসামির মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি আছে কি না, কিংবা প্রত্যর্পণের পর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাবনা রয়েছে কি না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়া সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ-কে বাংলাদেশে ফেরানোর পথে অন্যতম বড় বাধা হলো দুই দেশের মধ্যে অপরাধী প্রত্যর্পণ এবং বিচারিক সহযোগিতা সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা সমঝোতা কাঠামো না থাকা।
এ কারণে পুরো প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অত্যন্ত বিস্তারিত ও নির্ভুল নথি উপস্থাপন করতে হবে। এর মধ্যে থাকবে মামলার সম্পূর্ণ বিবরণ, আদালতের আদেশ, অভিযোগের ভিত্তি এবং কেন তাকে বাংলাদেশে ওয়ান্টেড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ আইনি ব্যাখ্যা। এসব তথ্য নির্ভুলভাবে প্রস্তুত করে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠাতে হবে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই ইন্টারপোলের রেড নোটিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রেড নোটিশের তালিকায় থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যেও এমন অনেক নাম রয়েছে, যাদের ক্ষেত্রে শুধু নোটিশ জারি হলেও প্রত্যর্পণ নিশ্চিত হয়নি।
আইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, বেনজীর আহমেদ-এর ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা কৌশলও সামনে আসতে পারে। তিনি দুবাইয়ে আইনজীবী নিয়োগ করে মামলাটিকে রাজনৈতিক বা প্রতিহিংসামূলক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষকে শক্তিশালী প্রমাণ ও সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি উপস্থাপন করতে হবে, পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার করতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, তার প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা অতীতের অনেক রেড নোটিশভুক্ত আসামির তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি। এর কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হচ্ছে।
প্রথমত, তিনি বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হেফাজতে আছেন। অনেক ক্ষেত্রে রেড নোটিশ থাকলেও আসামির অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি বা সংশ্লিষ্ট দেশ তাকে আটক করেনি। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই বাধা নেই।
দ্বিতীয়ত, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ মূলত আর্থিক অপরাধ ও দুর্নীতিকেন্দ্রিক, যা সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ বেশি থাকে। রাজনৈতিক চরিত্রের অভিযোগের তুলনায় এমন মামলা আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের একাধিক মামলার অভিযোগপত্র প্রত্যর্পণ অনুরোধকে আইনি ভিত্তি দেয়। এগুলো প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে সম্ভাবনা বেশি মানেই প্রত্যর্পণ নিশ্চিত নয়। দুবাইয়ের আদালতে তার পক্ষ থেকে আইনজীবীরা আপত্তি জানাতে পারেন। তারা দাবি করতে পারেন, মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বিচার নিরপেক্ষ নয়, অথবা আইনি প্রক্রিয়ায় ত্রুটি রয়েছে। এসব যুক্তি খণ্ডাতে বাংলাদেশকে শক্ত নথি, পরিষ্কার আইনি ব্যাখ্যা এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইন অনুযায়ী গ্রেফতারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হয়। এই সময়সীমা মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুতের কাজ চলছে।
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশন ইতোমধ্যে মামলার নথি, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও তদন্ত সংক্রান্ত দলিল প্রস্তুত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রস্তাব অনুমোদনের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠাবে এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় এনসিবিতে চিঠি হস্তান্তর:
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ-কে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে তার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার কপি পুলিশের বিশেষ শাখা এনসিবিতে পাঠানো হয়েছে।
গত সোমবার ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম জানান, সাবেক এই আইজিপির বিরুদ্ধে থাকা মামলা, অভিযোগের ধরন এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত তথ্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তার ভাষায়, প্রয়োজনীয় ওয়ারেন্টের কপি পুলিশের মাধ্যমে এনসিবিতে দেওয়া হয়েছে, যা পরে ইন্টারপোলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক চ্যানেলে পাঠানো হবে।
তিনি আরও বলেন, ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠানো হবে। তদন্ত সংস্থা থেকে এনসিবির কাছে চিঠি যাবে, এরপর সেটি আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার মাধ্যমে পরবর্তী ধাপে পৌঁছাবে। পুরো প্রক্রিয়াটি কূটনৈতিক ও পুলিশি সমন্বয়ের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হবে।
এদিকে সাবেক আইজিপি বাহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও এটি বাধ্যতামূলক শর্ত নয়। তার মতে, চুক্তি থাকলে প্রক্রিয়া সহজ হতো, তবে দুই দেশের সরকারের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমেও প্রত্যর্পণ সম্ভব। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে, থাইল্যান্ডের সঙ্গেও অনুরূপ ব্যবস্থা আছে। তবে চুক্তি না থাকলেও কূটনৈতিক সম্পর্ক ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে আসামি ফেরানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে এখন বেনজীর আহমেদ-কে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে এটি কত দ্রুত এবং কতটা সফলভাবে সম্পন্ন হবে, তা নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক নথি যাচাই, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
রেড নোটিশ কি সত্যিই গ্রেফতারি পরোয়ানা:
অনেকেই ইন্টারপোলের রেড নোটিশকে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা হিসেবে ধরে নেন কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন ও ইন্টারপোলের কাঠামো অনুযায়ী এই দুইটি বিষয় এক নয়। ইন্টারপোল-এর রেড নোটিশ মূলত একটি আন্তর্জাতিক সতর্কতা ব্যবস্থা। কোনো দেশের আদালত বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি কোনো পলাতক আসামিকে শনাক্ত করে আটক ও প্রত্যর্পণ করতে চায়, তখন তারা ইন্টারপোলের মাধ্যমে এই নোটিশ জারির অনুরোধ করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো পলাতক ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করা, সদস্য দেশগুলোকে সতর্ক করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে আটক করার সুযোগ তৈরি করা।
তবে রেড নোটিশ কোনো বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা নয়। এটি মূলত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি একটি অনুরোধ বা সতর্কবার্তা। প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব আইন ও নীতিমালার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়—চাইলে তারা নোটিশ অনুযায়ী কাউকে আটক করতে পারে, আবার চাইলে নাও করতে পারে।
ইন্টারপোল কীভাবে কাজ করে:
ইন্টারপোল মূলত সদস্য দেশগুলোর পুলিশ ব্যবস্থার মধ্যে একটি বৈশ্বিক সমন্বয় কাঠামো হিসেবে কাজ করে। সংস্থাটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের পুলিশ একে অপরের সঙ্গে এবং ইন্টারপোলের সাধারণ সচিবালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে তথ্য বিনিময় ও তদন্ত সহযোগিতায় যুক্ত থাকে।
প্রতিটি সদস্য দেশে একটি করে জাতীয় কেন্দ্রীয় ব্যুরো বা এনসিবি থাকে। এই এনসিবি-ই জাতীয় পুলিশের সঙ্গে ইন্টারপোলের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সংযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এর মাধ্যমে অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য, সন্দেহভাজন ব্যক্তির অবস্থান এবং তদন্তের অগ্রগতি দ্রুত আদান-প্রদান করা হয়।
সদস্য দেশগুলো নিয়মিতভাবে নীতি, কার্যপদ্ধতি, অর্থায়ন এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়। পাশাপাশি অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সমন্বয় জোরদার করতে প্রতি বছর এনসিবি প্রধানদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
ইন্টারপোলের কার্যক্রমের একটি বড় অংশ হলো আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলা। বিশেষ করে সাইবার অপরাধ, সংগঠিত অপরাধী চক্রের কার্যক্রম বা চোরাচালান যখন একটি দেশের সীমা অতিক্রম করে অন্য দেশে বিস্তৃত হয়, তখন ইন্টারপোল সদস্য দেশগুলোকে তথ্য ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সহায়তা করে।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, ইন্টারপোলের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে ইতোমধ্যে অনেক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ-এর ক্ষেত্রেও প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুবাইয়ের এনসিবি বরাবর বাংলাদেশ পুলিশের এনসিবি থেকে চিঠি পাঠানো হবে। এরপর দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক যোগাযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ইন্টারপোলের তালিকায় ৫৯ বাংলাদেশি:
ইন্টারপোল-এর অফিসিয়াল তথ্য এবং বাংলাদেশ পুলিশের জাতীয় কেন্দ্রীয় ব্যুরোর (এনসিবি) রেকর্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশের বহু পলাতক আসামির বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি রয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসী, যুদ্ধাপরাধের দণ্ডিত আসামি, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মামলার অভিযুক্ত এবং বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।
ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৬ হাজার ৪৪২ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের ৫৯ জনের নাম রয়েছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত রাজু ঢালি (৪২)। তার বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুর থেকে রেড নোটিশ জারির অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
চার নম্বরে রয়েছে রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খানের নাম। দুবাইয়ে অবস্থানকারী এই সোনা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ঢাকায় এক পুলিশ পরিদর্শক হত্যা মামলার অভিযোগে বাংলাদেশ থেকে রেড নোটিশের অনুরোধ করা হয়। তালিকায় আরও রয়েছে চট্টগ্রামের একাধিক হত্যা মামলার আসামি সাজ্জাদ হোসেন (৪৭), শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীর, প্রকাশ, জিসান এবং গোলাম ফারুক অভি।
এছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দণ্ডিত পলাতক আসামি খন্দকার আবদুর রশীদ ও শরীফুল হক ডালিমের নামও তালিকায় রয়েছে। ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত আবুল কালাম আজাদ এবং সৈয়দ হাসান আলীর নামও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
আন্তর্জাতিক এই তালিকায় শুধু বাংলাদেশই নয়, অন্যান্য দেশ থেকেও বহু পলাতক আসামি রয়েছে। যেমন ভারতের ২২৮ জন, পাকিস্তানের ১৭১ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ জনের নাম ইন্টারপোলের রেড নোটিশ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সব মিলিয়ে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কোনো শেষ ধাপ নয়, বরং একটি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র। আইন, প্রমাণ, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট দেশের বিচারব্যবস্থার সমন্বয় ছাড়া কোনো পলাতক আসামিকে ফিরিয়ে আনা সহজ হয় না। ফলে একজন অভিযুক্ত গ্রেফতার হলেও তাকে দেশে ফেরানোর বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল ও সময়সাপেক্ষ।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন থেকে যায়—আন্তর্জাতিক আইন ও সহযোগিতার এই জালে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার কতটা দ্রুত পৌঁছাতে পারে, আর কতটা ধীর পথ পেরিয়ে তা বাস্তব রূপ নেয়।

