সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারীদের ওপর প্রকাশ্য নির্যাতনের একের পর এক ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। শুধু পারিবারিক পরিসরেই নয়, জনসম্মুখেও নারীদের ওপর হামলা, অপমান ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা সমাজে নারীর অবস্থান, নিরাপত্তা এবং নারীদের প্রতি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় এক নারীকে প্রকাশ্যে মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, ভুক্তভোগী নারীর স্বামীর বকেয়া বেতন চাওয়া এবং মাছ ধরার জাল নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয় যুবদলের এক নেতার নেতৃত্বে ওই হামলা চালানো হয়। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অভিযুক্ত সফিককে উপজেলা যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায়ও এক নারীর ওপর নির্যাতনের ঘটনা আলোচনায় আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, স্বামীর মারধরে অচেতন হওয়ার পর তাঁকে বাবার বাড়িতে পাঠানোর উদ্দেশ্যে একটি টমটমে তোলা হয়। পথে তাঁর জ্ঞান ফিরে এলে আবারও নির্যাতনের চেষ্টা করা হয়। এ সময় স্থানীয় লোকজন বিষয়টি দেখে হস্তক্ষেপ করেন। পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় ওই নারীকে উদ্ধার করা হয় এবং অভিযুক্ত স্বামী ও শ্বশুরকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয় বিয়ের পর স্বামী নিয়মিত নির্যাতন করতেন, যাতে স্ত্রী বাধ্য হয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান।
এ ধরনের ঘটনা শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। শরীয়তপুরে এক নারীকে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। তাঁর চুল কেটে দেওয়া এবং মুখে কালি মাখিয়ে দেওয়ার কথাও জানা যায়। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার হাতুড় ইউনিয়নে এক নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ, স্থানীয় একটি মানববন্ধনে বক্তব্য দেওয়ার জের ধরে তাঁর ওপর এই হামলা চালানো হয়। অন্যদিকে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে জমি সংক্রান্ত বিরোধের ঘটনায় এক সাঁওতাল নারীকে মারধর এবং তাঁর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পরপর ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা অনেকের মতে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং নারীদের দমন, অপমান ও নিয়ন্ত্রণের একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। সমাজে এখনও এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, নারীর স্বাধীন চলাফেরা বা পোশাকের স্বাধীনতা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ৬৪ শতাংশ মনে করেন, সারা শরীর আবৃত না করে চলাফেরা করা নারীকে ‘ভালো মেয়ে’ বলা যায় না।
গবেষণাটি আরও বলছে, এমন ধারণা থেকে অনেকেই মনে করেন, তথাকথিত ‘অগ্রহণযোগ্য’ আচরণ থেকে নারীদের বিরত রাখতে তাঁদের অপমান, হেয় বা শাস্তি দেওয়া সমাজের জন্য উপকারী। গবেষকদের মতে, এই ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাস নারী নির্যাতনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। (সূত্র: ‘বাংলাদেশে ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সহজ বিস্তার এবং নারীর প্রতি সহিংসতা’ শীর্ষক গবেষণা)
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীবিদ্বেষ শুধু পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক নারীও নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের কারণে অন্য নারীর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে নারীদের প্রতি অবমাননাকর ও বৈষম্যমূলক ধারণা বিদ্যমান।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৭৯ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, সমাজে নারীদের নিয়ে বিভিন্ন যুক্তিহীন ও অসম্মানজনক ধারণা প্রচলিত রয়েছে। একইসঙ্গে ৮১ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, বহু কিশোর, যুবক ও প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নিয়মিত এমন কনটেন্ট দেখেন, যেখানে নারীদের অবমাননা বা হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।
এছাড়া ৫৩ শতাংশ উত্তরদাতা বিশ্বাস করেন, ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির ঘটনায় নারীদেরও দায় রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সমাজের অর্ধেকের বেশি মানুষ যখন এমন ধারণা পোষণ করেন, তখন নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কমিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
নারী নির্যাতনের চিত্র পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৫৩২ জন নারী এবং ৩৭৬ জন শিশু-কিশোরীসহ মোট ৯৩৬ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় ২২০ জন নিহত হয়েছেন এবং ৮১ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১৮৩ জন নারী। এর মধ্যে স্বামীর হাতে নিহত হয়েছেন ৭৪ জন এবং নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৪৯ জন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের জরিপ, যা ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়, সেখানে দেখা যায় দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এই সহিংসতার মধ্যে শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণও অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, নারীকে নিয়ন্ত্রণ ও শায়েস্তা করার মানসিকতা থেকে সমাজে নারীবিদ্বেষ আরও শক্তিশালী হচ্ছে। এর প্রভাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যমে নারীকে অপমান, হেয় বা সহিংসতার শিকার করার প্রবণতা ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে, যা নতুন প্রজন্মের চিন্তাভাবনার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারী বিদ্বেষকে অপরাধ হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। অন্যথায় এক ঘটনার পর আরেক ঘটনা ঘটতেই থাকবে, আর নির্যাতনের শিকার হতে থাকবে অসংখ্য নারী।
প্রশ্নটি এখন শুধু আইন প্রয়োগের নয়, বরং সমাজ কোন মূল্যবোধে দাঁড়িয়ে আছে সেটিও বিবেচনার বিষয়। যদি একজন নারীর স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে এখনও বিতর্কের বিষয় হিসেবে দেখা হয়, তাহলে নতুন আইন বা কঠোর শাস্তিও দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না। নারীর প্রতি বিদ্বেষকে স্বাভাবিক মনে করার সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে নির্যাতনের খবর বদলাবে, কিন্তু নির্যাতনের বাস্তবতা বদলাবে না।

