দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা আমানতের টাকা ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন হাজারো মানুষ। কেউ অবসরের সঞ্চয়, কেউ সন্তানের পড়াশোনার খরচ, আবার কেউ চিকিৎসা বা পারিবারিক নিরাপত্তার কথা ভেবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা রেখেছিলেন। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সেই অর্থ ফেরত না পাওয়ায় তাদের অনেকেই আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে দুর্বল ও সংকটে থাকা কয়েকটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআই অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এর মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে আমানত ফেরতের একটি সম্ভাব্য সীমা। বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে, একজন ব্যক্তি আমানতকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পেতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবুও সম্ভাব্য এ সীমা নিয়ে উদ্বেগ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে।
অধিকাংশ আমানতকারীর প্রশ্ন, বৈধ ও অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে যদি কেউ ২০ লাখ, ৩০ লাখ বা ৫০ লাখ টাকা জমা রাখেন, তাহলে তিনি কেন তার পুরো অর্থ ফেরত পাবেন না? তারা মনে করছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম বা দুর্নীতির দায় কোনোভাবেই সাধারণ গ্রাহকের কাঁধে চাপানো উচিত নয়।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, তারা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা রেখেছিলেন। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির আওতায় থাকার কথা। ফলে পরবর্তীতে যদি অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ বা ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার ঘটনা ঘটে, তাহলে তার দায় আমানতকারীদের ওপর বর্তানো ন্যায়সঙ্গত হবে না।
এনবিএফআই খাতের সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের নানা অনিয়ম, বিতর্কিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন তদন্তে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ অর্থ বেনামি ঋণ, জালিয়াতি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এসব ঘটনার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তারা আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে অক্ষম হয়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অবসায়নের আওতায় আসা পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর মোট ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস।
এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে তা প্রায় শতভাগের কাছাকাছি। ফলে তাদের সম্পদ ও দায়দেনার মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় প্রশাসক নিয়োগ, সম্পদ মূল্যায়ন এবং পরবর্তী অবসায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমানত ফেরতের পথ খোঁজা হচ্ছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটি বিভিন্ন মহল থেকে পাওয়া একাধিক প্রস্তাবের মধ্যে একটি মাত্র। বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে এবং নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছেন।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখা। যদি মানুষ মনে করেন, রাষ্ট্রীয় অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা রেখেও তাদের পুরো সঞ্চয় ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, তাহলে ভবিষ্যতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ আচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট সমাধানে শুধু আমানত ফেরতের সীমা নির্ধারণই যথেষ্ট নয়। বরং লোপাট হওয়া অর্থ উদ্ধারে জোর দিতে হবে, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানের অবশিষ্ট সম্পদ বিক্রি বা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে আমানতকারীদের ক্ষতি যতটা সম্ভব কমাতে হবে।
অনেকের মতে, এ সংকটের কেন্দ্রে রয়েছেন সাধারণ আমানতকারীরা, যারা কোনো অপরাধ করেননি। তারা শুধু অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে তাদের সঞ্চয় রেখেছিলেন। ফলে সমাধান এমন হতে হবে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায় এবং আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের বিশ্বাস আরও দুর্বল না হয়।
বর্তমানে সবার নজর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। কারণ এই সিদ্ধান্ত শুধু কয়েক হাজার আমানতকারীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং দেশের আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

