মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী খসড়ায় দ্রুত বিচার নিশ্চিতের জন্য জেলা ও মহানগরে পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব রাখা হলেও মাদক চক্রের মূল নিয়ন্ত্রক বা ‘গডফাদার’ শনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনুসন্ধান বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এতে আইনটি মূল অপরাধ দমনে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা সংশোধনী খসড়াটি আজ মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, পাঁচ বছর বা তার বেশি সাজাযোগ্য অপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে দেশজুড়ে এক বা একাধিক মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যাবে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে মাদক মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং বিচার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু বিচার কাঠামো পরিবর্তন করলেই মাদক নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না, যদি তদন্ত ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার না আনা হয়।
খসড়াটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এতে মূলত আদালতের কাঠামো, মামলা পরিচালনা ও আপিল প্রক্রিয়াকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক চেইন, অর্থদাতা, নেপথ্যের নিয়ন্ত্রক এবং আন্তর্জাতিক যোগসূত্র শনাক্তের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক নির্দেশনা নেই।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ছয় লাখের বেশি মাদক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব মামলা ঝুলে থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী পাওয়া যায় না এবং আসামিরা বিচার প্রক্রিয়া থেকে সহজেই বেরিয়ে যান।
সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্ত দুর্বল থাকা এবং সাক্ষীর অনুপস্থিতি মাদক মামলার বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রেই শুধু উদ্ধার হওয়া মাদক দেখিয়েই মামলা এগিয়ে নেওয়া হয়, কিন্তু উৎস, অর্থায়ন ও নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করা হয় না।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বড় মাদক চক্র ভাঙতে হলে শুধু বাহক বা খুচরা বিক্রেতাকে নয়, বরং অর্থদাতা, সংগঠক ও নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা বাধ্যতামূলক করা দরকার। পাশাপাশি ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ অনুসন্ধান ও অর্থপাচার তদন্তকে একীভূত করা হলে অপরাধ দমন কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের এক সরকারি কৌঁসুলি বলেন, বর্তমান কাঠামোয় অধিকাংশ মামলায় শুধু ধরা পড়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়, কিন্তু মূল নেটওয়ার্ক অদৃশ্য থেকে যায়। ফলে জামিনে মুক্ত হয়ে অনেকে আবার একই চক্রে ফিরে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ট্রাইব্যুনাল গঠন একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও তদন্ত ও আর্থিক অনুসন্ধানের বাধ্যবাধকতা না থাকলে আইনটির কাঙ্ক্ষিত প্রভাব সীমিত থাকবে। তারা বলছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পেতে হলে অপরাধের উৎস ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভাঙার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

