সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ এক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ। আগের বছর এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এসএনবির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিনিময় হার ধরে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকার সমপরিমাণ। ২০২১ সালের পর এটিই সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ আমানতের রেকর্ড। গত এক দশকের হিসাবেও এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সুইস ব্যাংকে সর্বোচ্চ আমানত রয়েছে ভারতের। ২০২৫ সালে ভারতীয় নাগরিক ও দেশটির ব্যাংকগুলোর আমানতের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। তবে আগের বছরের তুলনায় তাদের আমানত প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আমানত বেড়ে ৮৩৪ দশমিক ২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছেছে।
এর আগে ২০২১ সালে বাংলাদেশিদের সুইস ব্যাংক আমানত সর্বোচ্চ ৮৭১ দশমিক ১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে উঠেছিল। এরপর দুই বছর কমলেও ২০২৪ সালে আবার বৃদ্ধি শুরু হয় এবং ২০২৫ সালে তা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, সুইস ব্যাংক কোনো দেশের নাগরিকদের বৈধ ও অবৈধ উভয় ধরনের সম্পদের গন্তব্য হতে পারে। তবে সুইস ব্যাংকে থাকা অর্থের পুরোটা অবৈধ অর্থ বা পাচারকৃত অর্থ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কারণ সেখানে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের বৈধ আমানতও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা গবেষণা ও প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কেম্যান আইল্যান্ড এবং ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসকে অর্থ স্থানান্তরের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সময়ে কত অর্থ পাচার হয়েছে, সে বিষয়ে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব ও অনুমান রয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অর্থ পাচার নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে এবং এ বিষয়ে তদন্ত ও পর্যালোচনার জন্য শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির তথ্য উদ্ধৃত করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দাবি করেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে চলে গেছে। তার ভাষ্যমতে, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে।
বর্তমান সরকারও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার জানানো হয়েছে, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও দেশে ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চলতি বাজেটেও এ বিষয়ে কিছু পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধির সাম্প্রতিক তথ্য নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের একটি অংশের মতে, আমানত বৃদ্ধির কারণ, অর্থের উৎস এবং এর প্রকৃত চরিত্র সম্পর্কে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি সম্পদের বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জোরালো হচ্ছে।
অর্থ পাচার নিয়ে বিতর্কের মুখে ইউনূস সরকার:
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থ পাচার রোধ এবং বিদেশে চলে যাওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে একাধিকবার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিল। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ লক্ষ্যে সরকারপ্রধান ড. ইউনূস বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম ও বিদেশ সফরে অর্থ পাচারবিরোধী অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। তবে সমালোচকদের দাবি, এসব উদ্যোগের দৃশ্যমান ফল এখনো স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি। তাদের মতে, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে সরকারের ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব অগ্রগতির মধ্যে ব্যবধান রয়ে গেছে।
একই ধরনের আলোচনা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে ঘিরেও। দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও ফেরত আনার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। পরে তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক আইনি ও আর্থিক প্রক্রিয়ার কারণে এ ধরনের সম্পদ পুনরুদ্ধার দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল কাজ।
এদিকে বিভিন্ন মহলে আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আদালতের রায় বা সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টাকেও ঘিরে বিভিন্ন সময় দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি।
এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাহিদ ইসলামসহ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থ পাচারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য বা অভিযোগের পাশাপাশি প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় নির্ধারণ। কারণ প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান ছাড়া এ ধরনের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা কঠিন।
সমালোচকদের মতে, অর্থ পাচার ইস্যুতে কার্যকর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলা হয়, যা ব্যবসায়ী মহল এবং বেসরকারি খাতে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
সমালোচকদের আরও অভিযোগ, অর্থ পাচার সংক্রান্ত আলোচনায় প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত ও বিচারের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন বিতর্ক বেড়েছে, অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিদেশে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অতীত কিংবা বর্তমান—যে সময়েই অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটে থাকুক না কেন, তার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থ পাচারবিরোধী কার্যক্রম তখনই কার্যকর হবে যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবার জন্য একই আইনি মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত—এ বিষয়টি বিবেচ্য না হয়ে অভিযোগের সত্যতা ও প্রমাণই হওয়া উচিত তদন্তের মূল ভিত্তি।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশে চলে যাওয়া অবৈধ অর্থ শনাক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে তা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে অর্থ পাচার ঠেকাতে আর্থিক খাতের নজরদারি জোরদার, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
তাদের মতে, অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং আইনি প্রক্রিয়া ও প্রমাণের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করা উচিত। সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনের সমান প্রয়োগের মাধ্যমেই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

