চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ ও তার সহযোগীদের নিয়ে গঠিত একটি বাহিনী। সরকারি প্রতিষ্ঠানে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি, বালুমহাল দখল, অপহরণ বাণিজ্য এবং চুক্তিভিত্তিক হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয়ভাবে এই বাহিনীকে ঘিরে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদ বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও প্রযুক্তির সহায়তায় তিনি তার অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার নির্দেশেই এই বাহিনী চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া—এই সাতটি থানায় কয়েক লাখ মানুষ এই বাহিনীর কারণে আতঙ্কের মধ্যে আছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এই গোষ্ঠীর তৎপরতা আরও বেড়ে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ওই সময় থেকে চট্টগ্রামে জোড়া খুনসহ অন্তত ১১টি হত্যাকাণ্ডে তাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে।
সর্বশেষ গত ১৪ জুন নগরের পাঁচলাইশ থানায় চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলামের টেবিলে অস্ত্র রেখে তাকে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় বড় সাজ্জাদ পরিচয়ে একজন ব্যক্তি মোবাইল ফোনে ওই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন বলেও জানা যায়। টেন্ডারে তার পছন্দের ঠিকাদার কাজ না পেলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
তবে এ ঘটনায় এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলাম বলেন, তিনি বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছেন। তবে এখনো থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
বড় সাজ্জাদ আসলে কে?
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিয়াতলী এলাকার আবদুল গণি কন্ট্রাক্টরের ছেলে সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে তার নাম বিভিন্ন ঘটনায় আলোচনায় আসে। সে সময় থেকেই তিনি অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
প্রাথমিকভাবে তাকে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ক্যাডার হিসেবে পরিচিত করা হলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে একাধিকবার বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সাজ্জাদ আলী খান তাদের কেউ নন এবং তার সঙ্গে সংগঠনের কোনো সম্পর্ক নেই।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তার বিরুদ্ধে খুনসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ১৯৯৯ সালের ২ জুন চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খানকে তার বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় সাজ্জাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলেও সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় তিনি মামলা থেকে খালাস পান।
এরপর ২০০০ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় একটি মাইক্রোবাসে থাকা ছাত্রলীগের ছয় নেতাকর্মীর ওপর গুলি চালানো হয়। ঘটনাস্থলেই ছয়জনসহ মোট আটজন নিহত হন। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড, যা ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত, সেখানে সাজ্জাদ নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে ২০০০ সালের ১ অক্টোবর একে-৪৭ রাইফেলসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২০০৪ সালে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি দেশ ত্যাগ করেন বলে জানা যায়। এরপর থেকেই বিদেশে অবস্থান করে তিনি তার অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি রয়েছে, যা এখনো কার্যকর রয়েছে।
চট্টগ্রামে আলোচিত বড় সাজ্জাদ বাহিনী গঠনের শুরুতে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে নিয়ে দল গড়ে তোলেন সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। প্রাথমিক পর্যায়ে এই দলে ছিলেন নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন বাবলা এবং আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবর। তাদের নিয়েই নগরের অপরাধজগতের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অস্ত্র মামলায় নুরনবী ম্যাক্সনের ২১ বছরের কারাদণ্ড হয়। পরে তিনি পলাতক অবস্থায় ভারতে চলে যান এবং ২০২২ সালের শেষ দিকে সেখানে তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে সরোয়ার হোসেন বাবলা ও আকবর আলী এক পর্যায়ে দল থেকে আলাদা হয়ে যান। পরবর্তীতে পৃথক ঘটনায় এই দুইজনই গুলিতে নিহত হন বলে জানা যায়।
২০১৫ সালের পর থেকে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর নেতৃত্বে উঠে আসেন সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তার সঙ্গে তখন সক্রিয় ছিলেন মোবারক হোসেন ইমন এবং মোহাম্মদ রায়হান। গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিংমল থেকে ছোট সাজ্জাদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন বলে জানা যায়। তার বিরুদ্ধে ১০টি হত্যাসহ মোট ১৯টি মামলা রয়েছে।
ছোট সাজ্জাদ গ্রেফতারের পর বাহিনীর দায়িত্ব নেন রায়হান। তার বিরুদ্ধেও খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৪টি মামলা রয়েছে। একই সঙ্গে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী মোবারক হোসেন ইমনের বিরুদ্ধে বাকলিয়ায় জোড়া খুনসহ অন্তত ১০টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
এছাড়া এই বাহিনীর সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন খোরশেদ আলম, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মুবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদ।
সাজ্জাদ বাহিনীর আলোচিত যত হত্যাকাণ্ড:
চট্টগ্রামে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক আলোচিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত বছরের ৩০ মার্চ বাকলিয়া থানাধীন এক্সেস রোড এলাকায় ঘটে জোড়া খুনের ঘটনা। ওই দিন মধ্যরাতে শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে একটি প্রাইভেটকার বাকলিয়ার দিকে আসছিল। পথে প্রাইভেটকারটির পিছু নেয় পাঁচটি মোটরসাইকেল। এরপর গাড়িটিকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়।
ঘটনাস্থলেই প্রাইভেটকারে থাকা বখতিয়ার হোসেন (৩০) ও মো. আবদুল্লাহ (৩২) নিহত হন। তারা দলছুট সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলার অনুসারী ছিলেন বলে পরিচিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই ঘটনায় বড় সাজ্জাদ বাহিনীর সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে বলে জানা যায়।
এরপর গত বছরের ৫ নভেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন খন্দকারপাড়া এলাকায় চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগ চলাকালে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। এতে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। একই ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা নিহত হন। তিনি ১৫টি মামলার আসামি ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সরোয়ারের পরিবার বড় সাজ্জাদ বাহিনীকে দায়ী করে। গত বছরের ২৩ মে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবরকে। এই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের আসামি করা হয়।
সর্বশেষ ১৩ জুন রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে। দিনের বেলায় সংঘটিত এই ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী রায়হানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে জানা যায়।
চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় ব্যবসায়ী স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে দুই দফায় গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর অনুসারীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানের দাবি, তার কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। চাঁদা না দেওয়ায় তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। তার অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে চারজন অস্ত্রধারী তার বাড়িতে হামলা চালায় এবং ১২ থেকে ১৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে।
এর আগে ২ জানুয়ারি প্রথম দফায় ওই বাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। পরবর্তীতে পুলিশের তদন্তেও এই ঘটনায় বড় সাজ্জাদ বাহিনীর সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থানও উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (পিআর) আমিনুর রশিদ জানিয়েছেন, প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে অপরাধীরা এখন আরও সংগঠিতভাবে কাজ করছে। তার ভাষায়, এই সুযোগ ব্যবহার করে তারা চাঁদা আদায় করছে এবং হুমকি দিচ্ছে, ফলে অনেকেই ভয়ে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ দিয়ে দিচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, বড় সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি রয়েছে। তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করায় তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

