সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে ভাইরাল হওয়া ভিডিও নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যেই পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) বাবুল চন্দ্র রায়কে কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাকে অধিদফতরে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে মন্ত্রণালয় জানায়, প্রশাসনিক প্রয়োজনের কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাবুল চন্দ্র রায়কে দেবীগঞ্জ উপজেলা থেকে প্রত্যাহার করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাকে আগামী ২৪ জুনের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগদান না করলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্তমান দায়িত্ব থেকে অবমুক্ত বলে গণ্য হবেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা সামনে আসে। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনার সময় প্রকল্প বরাদ্দের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট শতাংশ অর্থের হিসাব ক্যালকুলেটরে নির্ণয় করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। ভিডিওটি প্রকাশের পর স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে প্রশাসনিক মহলেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ পাওয়া বিভিন্ন প্রকল্প থেকে কমিশন বা ঘুষ হিসেবে অর্থ দাবি করা হচ্ছিল। ভাইরাল ভিডিওতে বরাদ্দের অর্থের ওপর ১৫ শতাংশ হিসাব কষে টাকা নির্ধারণের দৃশ্য দেখা যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অনেকেই এটিকে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভিডিওটি প্রায় পাঁচ মিনিটের। সেখানে প্রকল্প বরাদ্দের পরিমাণ অনুযায়ী অর্থের হিসাব করতে দেখা যায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে। কথোপকথনের এক পর্যায়ে কমিশনের পরিমাণ নিয়ে দর-কষাকষির মতো পরিস্থিতিও ফুটে ওঠে, যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন বাবুল চন্দ্র রায়। তার দাবি, তিনি কোনো ধরনের ঘুষ বা কমিশন দাবি করেননি। বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভ্যাট, আয়কর, শ্রমিক ব্যয় ও অন্যান্য প্রশাসনিক খরচের হিসাব বুঝিয়ে দেওয়ার সময়কার একটি অংশ ভিডিও করে ভুলভাবে প্রচার করা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক সময় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য কিংবা প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন আর্থিক হিসাব জানতে চাইলে তিনি তা ব্যাখ্যা করে দেন। সেই ধরনের কোনো আলোচনাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এবং বলেছেন, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হলে অভিযোগের ভিত্তিহীনতা প্রমাণিত হবে।
এদিকে ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর জেলা প্রশাসনও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, ঘটনাটি প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। এ জন্য দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার ও উন্নয়ন কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পগুলো মূলত গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব প্রকল্পে অনিয়ম বা কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনস্বার্থ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা।
তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দেবীগঞ্জের ঘটনাটিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। তবে কেবল প্রত্যাহার নয়, অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায় প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অধিদফতরে সংযুক্ত হওয়ার নির্দেশ পেয়েছেন এবং তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে প্রশাসনসহ স্থানীয় জনগণ। অভিযোগ সত্য হলে এটি সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

