নাভানা গ্রুপ ও আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের মালিকপক্ষ এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতের রায় ও গ্রেফতারি পরোয়ানা ঘিরে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আদালতের আদেশ থাকা সত্ত্বেও এখনো তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
শ্রম আদালতের মামলা ও রায়:
নাভানা গ্রুপ ও আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের মালিকপক্ষের চারজন এবং চারজন শীর্ষ কর্মকর্তাসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে প্রথম শ্রম আদালতে মজুরি সংক্রান্ত একটি মামলা (মামলা নম্বর ১৫২/২০২০) দায়ের করেন কফিল উদ্দিন।
আসামিদের তালিকায় রয়েছেন, চেয়ারম্যান শফিউল ইসলাম কামাল, ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালেদা ইসলাম, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম সুমন, ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্রসহ শীর্ষ কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন মিয়া, ফারজানা ইয়াসমিন, ইমরান বিন ফেরদৌস ও মোহাম্মদ মনিরুল আলম।

গত ৮ মে ২০২৫ প্রথম শ্রম আদালতের চেয়ারম্যান (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ গোলাম আযম মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে কফিল উদ্দিনকে ২৩ লাখ টাকা পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালত আরও উল্লেখ করেন, এই অর্থ পরিশোধ না হলে বাদী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় গ্রেফতারি পরোয়ানা:
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ না করায় গত ৩ মে ২০২৬ তারিখে একই আটজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাকে তাদের গ্রেফতারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
তদন্ত ও তথ্যানুযায়ী, আটজনের মধ্যে সাতজন দেশে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। অনুপস্থিত রয়েছেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম সুমন, যিনি ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে কানাডায় অবস্থান করছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলের ত্রাণ উপকমিটির সদস্য ছিলেন ।
গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও গ্রেফতার হয়নি কেউ:
৩ মে ২০২৬ পরোয়ানা জারির পর ২৩ জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশে থাকা সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা বা ঢাকা মহানগর পুলিশ কোনো কার্যকর অভিযান চালায়নি। এদিকে নাভানা গ্রুপের প্রধান কার্যালয় তেজগাঁও এলাকায় এবং অন্যান্য কার্যালয় গুলশান এলাকায় অবস্থিত। অভিযোগ রয়েছে, ওয়ারেন্টভুক্ত ব্যক্তিরা নিয়মিত গুলশান অফিসে উপস্থিত হচ্ছেন।
অফিসে উপস্থিতি ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ:
অভিযোগ অনুযায়ী, গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্র সাম্প্রতিক সময়ে একটি ব্যক্তিগত জন্মোৎসবে অংশ নেন। সেখানে সমাজের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। এছাড়া চেয়ারম্যান শফিউল ইসলাম কামাল, ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালেদা ইসলাম এবং ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্র গুলশান ২ এলাকার ৭১ নম্বর রোডে নিজ নিজ বাসভবনে অবস্থান করছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
বিদেশি নাগরিকত্ব ও অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগ:
তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় অবস্থানরত সাইফুল ইসলাম সুমন এবং ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ২০২০ ও ২০২২ সালে প্রায় ৪ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে এন্টিগুয়া ও বারবুডার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন বলে উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, এ ধরনের বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণের জন্য দেশ থেকে অর্থ পাঠানোর কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং বিষয়টি অবৈধ হিসেবে বিবেচিত।
অর্থপাচার, দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগ: সাইফুল ইসলাম সুমনের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও অর্থপাচার
- কর্মচারী হয়রানি
- জালিয়াতি ও ভুয়া কোম্পানি ব্যবহার (যেমন কেবিজেড কোম্পানি লিমিটেড)
- অন্যের নামে জাল স্বাক্ষরে ঋণ গ্রহণ
অভিযোগ অনুযায়ী, আইএফআইসি ব্যাংকের ৫০–৫২ কোটি টাকার ঋণ সুদসহ প্রায় ৭০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এছাড়া হিনো বাস ভুয়া নিবন্ধনের ঘটনায় ন্যাশনাল ফাইন্যান্সের করা মামলা সিআইডিতে তদন্তাধীন রয়েছে (মামলা নম্বর ১২৪৯/২০২৪)।
জমি দখল ও হয়রানির অভিযোগ:
অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিষিদ্ধ একটি গোষ্ঠীর তহবিলে অর্থ সহায়তা দিতেন। কালীগঞ্জ এলাকায় নাভানা রিয়েল এস্টেটের হাইল্যান্ড–১ ও হাইল্যান্ড–২ প্রকল্পে সাধারণ মানুষের জমি ভয়ভীতি দেখিয়ে কম দামে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ কাজে একটি বাহিনী ব্যবহার করা হতো বলেও দাবি করা হয়েছে। তাদের মাধ্যমে প্রকল্পে গ্রাহক ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হতো বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের সাবেক ও পদত্যাগী কর্মীদের অভিযোগ, বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ পাওনা টাকা চাইলে তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা ও চাপ সৃষ্টি করা হয়।
সব মিলিয়ে আদালতের রায়, গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং তা কার্যকর না হওয়া সবকিছু ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে আইনের প্রয়োগ নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, একদিকে আদালতের নির্দেশ কার্যকর হচ্ছে না, অন্যদিকে অভিযুক্তরা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছেন। এ বিষয়ে রাষ্ট্র যদি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হয়, তবে দ্রুত গ্রেফতারি পরোয়ানা বাস্তবায়ন ও বিষয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন এমন দাবি উঠেছে।

