দেশজুড়ে মাদকের সহজলভ্যতা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইয়াবা, হেরোইন, আইস বা ফেনসিডিল—সব ধরনের মাদকই যেন হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে। গাঁজার ব্যবহারও অনেক এলাকায় প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে, অনেকটা বিড়ি-সিগারেট সেবনের মতোই স্বাভাবিক দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও বড় বড় জব্দ অভিযান চললেও মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য কমছে না।
বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষায়, এক চালান ধরা পড়লে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আরও বড় আকারের চোরাচালান নিয়ে সক্রিয় হচ্ছে মাদক চক্র। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত তিন মাসে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অভিযানে ৫০ লাখ ৮৯ হাজার ৮০৩ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে।
এর মধ্যেই বিভিন্ন সময়ে বড় বড় চালান ধরা পড়েছে সীমান্ত এলাকায়। যেমন ২২ জুন বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে ১ লাখ ৭৯০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ৫ জুন কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে পৃথক অভিযানে ৫ লাখ ৭২ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ হয়। ১১ এপ্রিল রামু ও উখিয়ায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ। একই সময়ে পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে মাদক সংক্রান্ত মামলায় ১৮ হাজার ২১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ ২৬ জুন পালিত হচ্ছে ‘মাদকদ্রব্য অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের মধ্যেই দেশের মাদক পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মাদকের বিস্তার থামছে না কেন: আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণ না হওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- সীমান্ত অঞ্চলের ভৌগোলিক দুর্বলতা
- মাদকের উচ্চ চাহিদা ও সহজলভ্যতা
- সিন্ডিকেট ও গডফাদারদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা
- সিনথেটিক মাদকের দ্রুত বিস্তার
- আইনি জটিলতা ও দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া
- পুনর্বাসন ব্যবস্থার ঘাটতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক মনে করেন, প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা মাদক সীমান্ত দিয়ে সহজে প্রবেশ করছে। তার মতে, কৃত্রিম মাদকের বিস্তার, শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং পুনর্বাসনের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। তিনি বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। পরিবার ও সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানী ঢাকায় মাদক বাণিজ্যের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, পল্লবীর বিহারি ক্যাম্পসহ বিভিন্ন বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাদক কার্যক্রম সক্রিয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের। তবে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। তার মতে, মাদকের উৎস সীমান্ত হওয়ায় সেখানে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা জরুরি।
বিজিবির মতে, দীর্ঘ সীমান্ত ও প্রতিবেশী অঞ্চলে সক্রিয় পাচার চক্রের কারণে মাদক প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিজিবির উপমহাপরিচালক কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম বলেন, সমন্বিত অভিযান, গোয়েন্দা তথ্য এবং জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে প্রভাবশালী একটি চক্র জড়িত, যার মধ্যে বিভিন্ন স্তরের মানুষ রয়েছে। তার মতে, অনেক সময় ছোট পরিমাণ মাদক দেখিয়ে হয়রানিমূলক মামলার অভিযোগও ওঠে, যা বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা তৈরি করছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে ইয়াবার পাশাপাশি আইস, কোকেন, হেরোইন, ফেনসিডিল ও গাঁজার বড় পরিমাণ চালান জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে রাজধানীতে পুলিশের অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং শত শত গ্রেপ্তার হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, শুধু মার্চ থেকে মে পর্যন্ত দেশজুড়ে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক মানুষ মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, সব বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ এবং সামাজিক সচেতনতা ছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তার মতে, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর অভিযান চললেও সামাজিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হলে মাদকের বিস্তার পুরোপুরি থামানো কঠিন হবে।

