ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষ তৃতীয় দিনেও থামেনি। এক ব্যক্তির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ মঙ্গলবারও সহিংস রূপ নেয়। সংঘর্ষের জেরে কালীকচ্ছ বাজার ও আশপাশের এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে, বন্ধ রয়েছে ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান ও অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ফলে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, উপজেলার কালীকচ্ছ ইউনিয়নের ধর্মতীর্থ ও সূর্যকান্দি গ্রামের দুই ব্যক্তির মধ্যে অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধ থেকে প্রথমে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে তা দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে রূপ নেয়। রোববার সন্ধ্যায় শুরু হওয়া সহিংসতায় ধারালো অস্ত্র, লাঠিসোঁটা এবং ইটপাটকেল ব্যবহার করা হয়। এতে ধর্মতীর্থ গ্রামের বাসিন্দা হাদিম মিয়া বল্লমের আঘাতে নিহত হন।
নিহতের দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষুব্ধ লোকজন কালীকচ্ছ বাজারে হামলা চালিয়ে বহু দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। ক্ষতির মুখে পড়েন শুধু বিরোধে জড়িত পক্ষের ব্যবসায়ীরাই নন, অন্য অনেক নিরীহ ব্যবসায়ীও। বাজারজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান অনেকে।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফাঁকা গুলি ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করলেও উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। রাতের অন্ধকারেও কয়েকটি দোকানে লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া যায়।
মঙ্গলবার সকালে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ধর্মতীর্থ গ্রামের লোকজনের সঙ্গে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষও যোগ দেন। অপরদিকে সূর্যকান্দি গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে কালীকচ্ছ বাজার এলাকা আবারও সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং সংঘর্ষ চলতে থাকে।
সহিংসতার কারণে সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই আঞ্চলিক মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ঢাকা-হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন রুটের যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। বিকল্প সড়ক ব্যবহার করতে গিয়ে অনেক যানবাহনকে অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
কালীকচ্ছ বাজারের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান এবং অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও নিরাপত্তার স্বার্থে কার্যক্রম বন্ধ রাখে। ফলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
সংঘর্ষে আহত বেশ কয়েকজনকে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে আহতের সঠিক সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরাইল থানা পুলিশের পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। জেলা সদর থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিশেষায়িত বাহিনীর সদস্যদেরও ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সংঘর্ষ থামানোর চেষ্টা চালিয়ে গেলেও সংবাদ লেখা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে গ্রামভিত্তিক সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার প্রবণতা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় অতীতেও দেখা গেছে। দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, দোষীদের বিচারের আওতায় আনা এবং স্থানীয়ভাবে কার্যকর মধ্যস্থতার উদ্যোগ না নিলে এমন সংঘাত দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

