দেশে নিষিদ্ধঘোষিত বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনের অন্তত ৩১১ সদস্য বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তাঁদের সবাই উগ্রবাদী তৎপরতাসংক্রান্ত বিভিন্ন মামলার আসামি। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দিন গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে উগ্রবাদী তৎপরতার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ৯ বন্দীর পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান ও সম্ভাব্য তৎপরতা নিয়ে নজরদারি জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) গত এপ্রিল পর্যন্ত হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী, পলাতকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) ১৮৫ সদস্য। এছাড়া আনসার আল ইসলামের ৮৩ জন, হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) ১৬ জন, নব্য জেএমবির ১৬ জন, আল্লাহর দলের ৯ জন, জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার ১ জন এবং ইমাম মাহমুদের কাফেলার ১ জন সদস্য পলাতক। পৃথকভাবে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের আরও ৫৯ সদস্যও বিভিন্ন মামলায় পলাতক রয়েছেন বলে এটিইউর তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া, জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে থাকা এবং বিভিন্ন মামলার পলাতক উগ্রবাদীরা দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারেন। তাঁদের আশঙ্কা, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্রের বড় অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে রয়েছে। সুযোগ পেলে এসব ব্যক্তি আবারও সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
পলাতক উগ্রবাদীদের বিষয়ে কোনো নিরাপত্তা হুমকি রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে গত ৪ এপ্রিল এটিইউর প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. রেজাউল করিম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। তবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই এবং দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ উগ্রবাদকে সমর্থন করেন না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা প্রধান ফটক ভেঙে কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করে এবং তৃতীয় তলার গুদামে আগুন লাগিয়ে দেয়। ওই ঘটনায় উগ্রবাদী তৎপরতার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ৯ জনসহ মোট ২০২ বন্দী পালিয়ে যান।
এটিইউর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সারা দেশে নিষিদ্ধঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের ২ হাজার ১৪৩ সদস্য বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হন। ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬১১ জন। তাঁদের মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন ৩৮০ জন। বর্তমানে এসব মামলায় ১৬২ জন কারাগারে রয়েছেন।
এটিইউর হিসাব অনুযায়ী, দেশের ১৬টি কারাগারে উগ্রবাদী বিভিন্ন সংগঠনের ৫৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, ৪৬ জন যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত এবং ২৫ জন বিভিন্ন মেয়াদের সাজাপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন। এছাড়া আরও ৩২ জনের বিরুদ্ধে চলমান মামলার বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন আলোচিত উগ্রবাদী নেতাও রয়েছেন। তাঁদের একজন জসীম উদ্দিন রাহমানী, যিনি গত বছরের ২০ অক্টোবর জামিনে মুক্তি পান। আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর একটি ঢাকার সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালে এবং অন্যটি সাইবার ট্রাইব্যুনালে চলছে। পুলিশ মামলায় তাঁকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছে। যদিও মুক্তির পর বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি নিজেকে ওই সংগঠনের নেতা নন বলে দাবি করেছেন।
এদিকে নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবির প্রধান মাওলানা সাইদুর রহমান গত ২১ মার্চ কাশিমপুর-২ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন। এছাড়া গত ডিসেম্বরে ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি মহিলা মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশ যাঁকে মূল ব্যক্তি হিসেবে সন্দেহ করছে, সেই শেখ আল আমিন এবং তাঁর কয়েকজন সহযোগীও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন। পরে কেরানীগঞ্জের ঘটনার পর তাঁদের আবার গ্রেপ্তার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় পলাতক এবং জামিনে মুক্ত উগ্রবাদী তৎপরতায় জড়িত ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি শিথিল করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া, জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে থাকা এবং বিভিন্ন মামলার পলাতকদের অবস্থান শনাক্ত করা দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশে উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ওই সময়ে ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, শিক্ষক ও বিদেশি নাগরিক হত্যার মতো একাধিক ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালে রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ হামলার ঘটনাও সেই সময়ের অন্যতম বড় সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়। এরও আগে ২০০৫ সালে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে ৫০০টি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটায় জেএমবি।

