দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বিদেশি বিষাক্ত ও বিরল প্রাণীর অবৈধ আমদানি এবং বাণিজ্য। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে অভিযান চালিয়ে এক হাজারের বেশি বিদেশি প্রাণী উদ্ধার হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শখের পোষা প্রাণীর বাজার দ্রুত বিস্তৃত হওয়ায় আইন উপেক্ষা করে বিদেশ থেকে বিপজ্জনক প্রাণী এনে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং দেশের জীববৈচিত্র্য—তিনটিই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সাম্প্রতিক অভিযানে বন বিভাগ বিষাক্ত ট্যারান্টুলা মাকড়সা, ম্যাক্সিকান ব্ল্যাক কিং স্নেক, কর্ন স্নেক, ডামফি ফ্রগ, লেপার্ড গেকো, সাইডনেক কচ্ছপসহ মোট এক হাজার ১০৪টি বিদেশি প্রাণী উদ্ধার করেছে। এসব প্রাণী রাজধানীর একটি বাসায় সংরক্ষণ করে বিক্রির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর অনেকগুলোই বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের অংশ নয়। কিছু প্রাণী বিষাক্ত, কিছু আক্রমণাত্মক এবং কিছু বিভিন্ন রোগজীবাণুর বাহক হতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশে এসব প্রাণী আমদানি ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কঠোর আইন ও বিধিনিষেধ রয়েছে।
তবে বাস্তবে সেই নিষেধাজ্ঞা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশ থেকে অনুমোদিত কিছু পোষা প্রাণী আনার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসাধু চক্র অবৈধভাবে আরও অনেক নিষিদ্ধ প্রাণী দেশে প্রবেশ করাচ্ছে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গ্রুপ কিংবা ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এগুলোর কেনাবেচা চলছে।
বন্যপ্রাণী গবেষক ও প্রাণী কল্যাণকর্মীরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিরল ও অদ্ভুত প্রাণী পালনের প্রতি এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই নিজেকে আলাদা বা ব্যতিক্রমী হিসেবে তুলে ধরতে বিদেশি সাপ, বিষাক্ত মাকড়সা, ব্যাঙ কিংবা সরীসৃপ সংগ্রহ করছেন। এই চাহিদাকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি অবৈধ বাজার।
বিশেষজ্ঞদের সতর্ক করে দেওয়া মতে, বিদেশি প্রাণী যদি কোনোভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে দেশীয় প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। অনেক বিদেশি প্রজাতি দ্রুত বংশবিস্তার করে স্থানীয় প্রজাতির খাদ্য, আবাসস্থল ও পরিবেশ দখল করে নেয়। এর ফলে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
জনস্বাস্থ্য নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। বিভিন্ন বিদেশি সরীসৃপ, উভচর প্রাণী ও মাকড়সার মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা পরজীবী ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি বিষাক্ত প্রাণী পালনের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে পোষা প্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে আরও কঠোর নজরদারি, অনলাইনভিত্তিক অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে অবৈধভাবে বিদেশি প্রাণী আমদানি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিদেশি প্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য বন্ধে নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্নের কাজও চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের অবৈধ বাণিজ্য দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

