রপ্তানি থেকে অর্জিত প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এলেও তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ফরেন কারেন্সি (এফসি) হিসাবের জমা হয়নি—এমন গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশের আর্থিক খাতে নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, একই রপ্তানি লেনদেনের বিপরীতে গ্রাহকের সম্মতি ছাড়াই ফোর্সড লোন সৃষ্টি করা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে সেই ঋণকে দীর্ঘমেয়াদি টার্ম লোনে রূপান্তর করা হয়েছে।
কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে যৌথ অনুসন্ধানে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগের বিষয়গুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিরোধ নয়; বরং রপ্তানি আয় ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং হিসাব এবং আর্থিক প্রতিবেদন—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর বড় ধরনের প্রশ্ন তুলতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশকের রপ্তানি কার্যক্রমে কেয়া গ্রুপের পণ্যের বিপরীতে প্রায় ৬৬ কোটি মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এসেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভান্ডারে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ হচ্ছে, সেই অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এফসি হিসাবগুলোতে জমা করা হয়নি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এই অর্থের মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৩৯ কোটি ৪৬ লাখ ডলার, পূবালী ব্যাংকের মাধ্যমে ২০ কোটি ১৯ লাখ ডলার, ন্যাশনাল ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ কোটি ৮৫ লাখ ডলার এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৬৫ লাখ ডলার দেশে এসেছে বলে তথ্য রয়েছে। একই সঙ্গে এসব রপ্তানির বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো প্রসিড রিয়ালাইজেশন সার্টিফিকেট (পিআরসি) ইস্যু করেছে। এই সনদ সাধারণত নিশ্চিত করে যে রপ্তানি আয় বৈধভাবে দেশে এসেছে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ সম্পন্ন হয়েছে।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একই রপ্তানি লেনদেনের বিপরীতে কেয়া কসমেটিকসের নামে ফোর্সড লোন সৃষ্টি করা হয়েছে। পরে ধাপে ধাপে সেই ঋণকে টার্ম লোনে রূপান্তর করা হয়। প্রতিষ্ঠানের দাবি, এই প্রক্রিয়ার কারণে তাদের প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে। এর ফলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমও সংকটে পড়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। সাউথইস্ট ব্যাংক অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, তারা বিএসইসির বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পূবালী ব্যাংক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ন্যাশনাল ব্যাংকও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অন্যদিকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।
কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক পাঠানের দাবি, রপ্তানি আয়ের বিপরীতে ব্যাংকগুলো একই অর্থের ওপর একাধিকবার ডেবিট করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি অংশ আগেই নস্ট্রো হিসাব থেকে সমন্বয় করার পরও অবশিষ্ট অর্থ থেকেও পুনরায় একই পরিমাণ কেটে নেওয়া হয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এলেও তা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা হয়নি। এতে আমদানি ব্যয় পরিশোধে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে এবং পরবর্তীতে তাদের ওপর ফোর্সড লোনের বোঝা চাপানো হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসংক্রান্ত নির্দেশিকা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতো না। তার মতে, এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর হিসাবের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাবেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘটনার তদন্তে সক্রিয় রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনও। সংস্থাটি তিনটি মূল বিষয় যাচাই করছে। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট রপ্তানি আয়ের অর্থ প্রকৃতপক্ষে দেশে এসেছে কি না। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভান্ডারে রপ্তানি আয় আদায় হয়েছে বলে দেখানোর পরও একই লেনদেনের বিপরীতে কেন ফোর্সড লোন বহাল রয়েছে। তৃতীয়ত, পুরো প্রক্রিয়ায় অর্থ পাচার, ব্যাংকিং জালিয়াতি বা অন্য কোনো আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে কি না।
এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত বছর কেয়া কসমেটিকসের চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়। পরে সাউথইস্ট ব্যাংকের কাছে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চাওয়া হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ অপারেশন বিভাগ থেকেও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও বিষয়টি নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, কেয়া কসমেটিকসের রপ্তানি আয়ের ডলার দেশে এসেছে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। যদি কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভঙ্গ করে থাকে, তাহলে প্রচলিত ব্যাংকিং আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ করতে সময় প্রয়োজন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলও পৃথক অনুসন্ধানে নেমেছে। সংস্থাটি রপ্তানি আয়, ফোর্সড লোন, ফরেন ডকুমেন্ট বিলস পারচেজ, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, প্রতিষ্ঠানের পাওনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি তথ্য—এই ছয়টি বিষয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করছে।
এফআরসির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একই রপ্তানি লেনদেনকে ঘিরে অন্তত তিন ধরনের হিসাব বিদ্যমান। একটি বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি মনিটরিং তথ্য, দ্বিতীয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ঋণ ও লেনদেনের হিসাব এবং তৃতীয়টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণী। এই তিনটি তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে রপ্তানি আয়ের প্রকৃত অবস্থান, এফসি হিসাবে জমা হওয়া অর্থ এবং ঋণ সমন্বয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এফআরসি দুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট চার ব্যাংক থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস বিভাগ এবং বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগ। দ্বিতীয়ত, কেয়া কসমেটিকসের আর্থিক বিবরণীর ওপর বিএসইসির নিয়োগ দেওয়া বিশেষ নিরীক্ষকের প্রতিবেদনও বিবেচনায় নেওয়া হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এফআরসির চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন জানিয়েছেন, ঘটনার সুষ্ঠু সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র বিশ্লেষণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে বিএসইসির নিয়োগপ্রাপ্ত বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, কেয়া কসমেটিকস ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর লেনদেন পর্যালোচনার কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে এবং তদন্ত বর্তমানে বিশ্লেষণ পর্যায়ে রয়েছে।
আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, এ অনুসন্ধানের ফল শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং রপ্তানি আয়ের হিসাব সংরক্ষণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেবে। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে বৈদেশিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসবে।

