হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। একের পর এক বড় চালান জব্দ হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধরা পড়ছে না মূল বাহক বা চক্রের হোতারা। ফলে বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালানকারীদের অন্যতম প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট থেকে প্রায় ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম ওজনের ১৬০টি স্বর্ণের বার জব্দ করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থা, শুল্ক গোয়েন্দা, এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) এবং কাস্টমসের যৌথ অভিযানে বিমানের কার্গো হোল্ডে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা এই স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। তবে এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
শুধু সাম্প্রতিক এই ঘটনাই নয়, গত কয়েক বছরে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে একের পর এক বড় চালান জব্দ হয়েছে। ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ বছরে বিমানবন্দরটিতে শতাধিক অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৯০২ কেজি বা ৪৭ মণেরও বেশি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এসব স্বর্ণের মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে জব্দ হয় প্রায় ৬৯৮ কেজি স্বর্ণ। পরের অর্থবছরে উদ্ধার হয় ৫৫৫ কেজি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জব্দ হয় ৪১৭ কেজি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৯ কেজি। চলতি বছরেও ইতোমধ্যে ৬৩ কেজির বেশি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে।
স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় গত পাঁচ বছরে ৫৪০টি মামলা হয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাহক বা মূল অভিযুক্তকে শনাক্ত করা না যাওয়ায় মামলাগুলোতে আসামি হিসেবে ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ উল্লেখ করা হয়েছে। এতে পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, অধিকাংশ বড় চালান সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে আসে। এছাড়া সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও কুয়েত থেকেও স্বর্ণ পাচারের চেষ্টা হয়। চোরাকারবারিরা কখনো যাত্রীর শরীরে, কখনো বিমানের টয়লেট, কার্গো কম্পার্টমেন্ট, ট্রলি কিংবা অন্যান্য যন্ত্রাংশের ভেতরে বিশেষ কৌশলে স্বর্ণ লুকিয়ে আনে।
সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে চোরাচালানের কৌশলও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণ লুকাতে ব্যবহৃত হচ্ছে ট্রলির হাতল, হুইলচেয়ার, জুতা, কোমরের বেল্ট, শার্টের কলার, ল্যাপটপের ব্যাটারি, সাউন্ড সিস্টেমের অ্যাডাপ্টার, সাবানের কেস, ওষুধের কৌটা, বৈদ্যুতিক মোটর, এমনকি মানবদেহের অভ্যন্তরও। অনেক ক্ষেত্রে স্বর্ণের বারের ওপর কালো বা রুপালি প্রলেপ দিয়ে ধাতব যন্ত্রাংশের মতো দেখানোরও চেষ্টা করা হয়।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কিছু ঘটনায় বিমানবন্দরের ভেতরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে একই ধরনের কৌশলে ধারাবাহিকভাবে বড় চালান ধরা পড়ায় তদন্তকারীরা অভ্যন্তরীণ সহযোগিতার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় চালান নিয়মিত জব্দ হওয়া যেমন নজরদারি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, তেমনি এটাও প্রমাণ করে যে চোরাচালান চক্রগুলো এখনো সক্রিয় রয়েছে। তাদের ধারণা, যেসব চালান ধরা পড়ছে, তার বাইরে আরও কিছু চালান নজরদারি এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, উন্নত স্ক্যানিং প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশকে শুধু গন্তব্য নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশে স্বর্ণ পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে শুল্ক কাঠামোর পার্থক্য এবং আন্তর্জাতিক চোরাচালান সিন্ডিকেটের সক্রিয় নেটওয়ার্কের কারণে এই রুট তাদের কাছে লাভজনক হয়ে উঠেছে।
এদিকে সর্বশেষ বড় চালান উদ্ধারের পর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়েছে। অন্যদিকে কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের ভেতরে অভিযান জোরদারের পাশাপাশি বিদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

