বরিশালে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অণ্ডকোষ চেপে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে জোরপূর্বক চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগকে ঘিরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে জনমনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ভুক্তভোগী আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং আদালতের নির্দেশে মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, নগরীর সদর রোড এলাকায় অবস্থিত অগ্রণী হাউজিং লিমিটেডের কার্যালয়ে গত ২৭ জুন সন্ধ্যায় কয়েকজন ব্যক্তি প্রবেশ করে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আজিজ হাওলাদারকে মারধর করেন। একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে একটি ৭০ লাখ টাকার চেক, একটি সাদা চেক এবং দুটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
শনিবার রাতে ভুক্তভোগী নিজেই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। এরপর ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। ভিডিওতে কয়েকজন ব্যক্তিকে এমডির কক্ষে প্রবেশ করতে এবং পরে তাকে ঘিরে রাখার দৃশ্য দেখা যায়। একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন কাগজপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনাও ফুটে ওঠে। এ সময় ভুক্তভোগী সাহায্যের জন্য চিৎকার করলে বাইরে থেকে একজন ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তবে উপস্থিত অন্যরা তাকে বাধা দিয়ে বাইরে সরিয়ে দেন। পরে স্বাক্ষর নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া মোবাইল ফোনে ধারণ করতেও দেখা যায়।
ভুক্তভোগী আব্দুল আজিজ হাওলাদারের দাবি, অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু একসময় তাদের আবাসন ব্যবসার অংশীদার ছিলেন। পরবর্তীতে বিনিয়োগের বিপরীতে জমি হস্তান্তরের মাধ্যমে উভয় পক্ষের আর্থিক হিসাব চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করা হয় এবং কোনো পাওনা নেই—মর্মে লিখিত অঙ্গীকারনামাও দেওয়া হয়েছিল। এরপরও দীর্ঘদিন ধরে এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিলেন লিটু। সেই দাবির ধারাবাহিকতায় পরিকল্পিতভাবে অফিসে এসে তাকে নির্যাতন করে জোরপূর্বক চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, ঘটনার পরপরই সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়। ফলে স্বাক্ষর নেওয়া চেক ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলন সম্ভব হয়নি। পরে গত বৃহস্পতিবার তিনি আদালতে নালিশি মামলা দায়ের করেন। আদালত অভিযোগটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের জন্য কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার না করলেও ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু। তার দাবি, ঘটনাস্থলে যারা গিয়েছিলেন, তারা সবাই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। তার অভিযোগ, আব্দুল আজিজ প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরতে শিগগিরই সংবাদ সম্মেলন করা হবে বলেও জানান তিনি। তবে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত লিটু যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তার বড় ভাই মাহবুবুর রহমান পিন্টু মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি। তবে এ বিষয়ে দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করে বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আফরোজা খানম নাসরিন বলেন, কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রকাশ্যে কাউকে লাঞ্ছিত করা গ্রহণযোগ্য নয়। বিএনপি বা এর সহযোগী সংগঠনের কেউ জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আল মামুন উল ইসলাম জানান, ভুক্তভোগী মৌখিকভাবে থানাকে বিষয়টি অবহিত করেছেন। আদালতের লিখিত আদেশ থানায় পৌঁছানোর পর আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আইনজীবীদের মতে, জোরপূর্বক ভয়ভীতি দেখিয়ে কোনো ব্যক্তি থেকে চেক, স্ট্যাম্প বা আর্থিক দলিলে স্বাক্ষর আদায় করা হলে তা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। এ ধরনের ঘটনায় আদালতের নির্দেশে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াই বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ। বর্তমানে ভাইরাল হওয়া সিসিটিভি ফুটেজ, সংশ্লিষ্ট নথি এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

