একটি দেশের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে ওঠে তার শিশুদের সুস্বাস্থ্য ও মানসম্মত বিকাশের ওপর। সেই লক্ষ্য থেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চালু করা হয়েছে ‘স্কুল ফিডিং’ বা ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো, ঝরে পড়া কমানো এবং বিশেষ করে প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণে এটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই কর্মসূচির আওতায় সপ্তাহে পাঁচ দিন, অর্থাৎ রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পুষ্টিকর শুকনো খাবার সরবরাহ করার বিধান রয়েছে। নির্ধারিত খাদ্যতালিকায় রাখা হয়েছে পাঁচ ধরনের খাদ্য উপাদান। এর মধ্যে রয়েছে ১২০ গ্রাম ওজনের পুষ্টিকর পাউরুটি, ৬০ গ্রাম ওজনের একটি সেদ্ধ ডিম, ২০০ মিলিলিটার ইউএইচটি তরল দুধ, ৭৫ গ্রাম ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন বিস্কুট এবং ১০০ গ্রাম ওজনের মৌসুমি ফল, যা সাধারণত পাকা কলা। শিশুদের দৈনিক ক্যালোরি ও প্রোটিনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ এবং তাদের মেধা ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বিবেচনায় রেখেই এই খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে পরিকল্পনায় যতটা ইতিবাচক এই কর্মসূচি, বাস্তবায়নের চিত্র নিয়ে ততটাই উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ নিয়মিত সামনে আসছে।
নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের টাটকা ও মানসম্মত খাবার দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক বিদ্যালয়ে বিতরণ করা হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ পাউরুটি ও বিস্কুট। কোথাও কোথাও পাউরুটিতে ছত্রাক ও জীবাণুর উপস্থিতিও পাওয়া যাচ্ছে। ডিম সরবরাহেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত ৬০ গ্রাম ওজনের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে ছোট বা নিম্নমানের ডিম দেওয়া হচ্ছে, যা কখনো কখনো পচা বা বাসি অবস্থায় পাওয়া যায়। একইভাবে মৌসুমি ফল হিসেবে পাকা কলা দেওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে কাঁচা, অতিরিক্ত পাকা কিংবা পচা কলা বিতরণের অভিযোগ রয়েছে।
মানহীন ও ভেজাল খাদ্য শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার পরিবর্তে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন। তাদের মতে, ছত্রাকযুক্ত রুটি ও পচা ডিম খাওয়ার কারণে শিশুদের ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটব্যথা এবং দীর্ঘমেয়াদি হজমজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত বা নিম্নমানের বিস্কুট দাঁতের ক্ষয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই কর্মসূচির জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, তার একটি বড় অংশ দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তা ও অসাধু ঠিকাদারদের অনিয়মের কারণে অপচয় বা আত্মসাতের শিকার হচ্ছে। কার্যকর তদারকির অভাবে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে খাদ্য সরবরাহ ও বিতরণ প্রক্রিয়া নিয়মিত ও কঠোরভাবে তদারকির আওতায় আনতে হবে। এ জন্য স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী তদারকি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যের মান নিশ্চিত না করে কোনো খাদ্য বিতরণ করা যাবে না। মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহকারী ঠিকাদারদের কালো তালিকাভুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের অবহেলার সুযোগ নেই। সময়োপযোগী ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই স্কুল ফিডিং কর্মসূচিকে তার মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী শতভাগ সফল করা সম্ভব।

