বাজারে লেনদেনের সময় হাতে থাকা টাকার নোটটি আসল নাকি জাল—এ নিয়ে প্রায়ই দুশ্চিন্তায় পড়েন ব্যবসায়ী, ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষ। অনেক ক্ষেত্রে অজান্তেই কেউ জাল নোটের লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে জাল নোট তৈরির কৌশল আরও আধুনিক হওয়ায় এবার এ ধরনের অপরাধ দমনে নতুন আইন আনতে যাচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত আইনে জেনেশুনে জাল নোট নিজের কাছে রাখা বা ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এ লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ শিরোনামে আট পৃষ্ঠার একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। ইতোমধ্যে খসড়াটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছে মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের মতামতও আহ্বান করা হয়েছে।
জাল নোটের পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনার পরিকল্পনা:
প্রস্তাবিত আইনে শুধু জাল নোট তৈরি নয়, বরং উৎপাদন থেকে বাজারজাত পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাল নোট তৈরি, তৈরির চেষ্টা, বিশেষ কাগজ, কালি বা নিরাপত্তা উপকরণ সংগ্রহ, আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন, বিক্রি, সংরক্ষণ কিংবা বাজারজাত—সব ক্ষেত্রেই কঠোর শাস্তির প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, কেউ যদি জেনেশুনে জাল নোট নিজের কাছে রাখেন বা তা লেনদেনে ব্যবহার করেন, তাহলে তিনিও শাস্তির মুখোমুখি হবেন। এ অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
কেন নতুন আইন প্রয়োজন:
বর্তমানে জাল মুদ্রাসংক্রান্ত অপরাধের বিধান দণ্ডবিধিসহ বিভিন্ন আইনে ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রায়ই জটিলতা দেখা দেয়। নতুন আইনের মাধ্যমে এসব বিধানকে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জাল নোট তৈরিতে ব্যবহৃত কম্পিউটার, প্রিন্টিং যন্ত্র, বিশেষ কাগজ, কালি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করার বিধানও রাখা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে উদ্ধার হওয়া জাল নোট ও সংশ্লিষ্ট আলামত ধ্বংস করার ব্যবস্থাও থাকবে। এতে শুধু জাল নোট উদ্ধার নয়, বরং এর উৎপাদনব্যবস্থাও ভেঙে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন, বিভিন্ন পক্ষের মতামত সংগ্রহ শেষে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হবে। এরপর অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।
নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে জাল মুদ্রা:
খসড়া আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাল মুদ্রার বিভিন্ন ধরন স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা। এতে টেম্পার্ড, ব্লিচড এবং মিসম্যাচড নোটের পৃথক সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে শুধু সম্পূর্ণ নকল নোট নয়, আসল নোটে কারসাজি করে মূল্যমান বা নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা, রাসায়নিক ব্যবহার করে ছাপ মুছে নতুনভাবে মুদ্রণ করা কিংবা বিভিন্ন নোটের অংশ জোড়া দিয়ে নতুন নোট তৈরিও জাল মুদ্রা হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে এত দিন আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে যে বিতর্কের সুযোগ ছিল, তা অনেকটাই কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খসড়া আইনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত কারেন্সি অফিসারের দায়িত্বও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সন্দেহজনক কোনো নোট পরীক্ষা করে সেটি জাল কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রত্যয়ন দেবেন তিনি। আদালতে এই প্রত্যয়ন গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে। এতে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া আরও নির্ভরযোগ্য হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রস্তাবিত আইনে অধিকাংশ অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য এবং আপস-অযোগ্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে পুলিশ সরাসরি মামলা গ্রহণ ও তদন্ত করতে পারবে। একই সঙ্গে সহজে জামিন বা আপসের সুযোগও সীমিত থাকবে। তদন্ত, আলামত সংরক্ষণ, আদালতের এখতিয়ার এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়গুলোও আইনে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৫ সালের পর থেকে দেশে জাল নোট তৈরির পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একই সময়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রাজধানী ও সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালিয়ে জাল নোট তৈরির কারখানা ও সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। বিশেষ করে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগে নগদ অর্থের লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় এ সময় জাল নোট উদ্ধারের ঘটনাও বেশি দেখা যায়।
২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে জাল নোট শনাক্তে আরও সতর্ক হওয়ার নির্দেশনা দিয়ে আসছে। ব্যাংক শাখাগুলোতে নোট যাচাই যন্ত্র ব্যবহার, সন্দেহজনক নোট দ্রুত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানো এবং গ্রাহকদের সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
২০১৮ সালের পর বিভিন্ন তদন্তে উঠে আসে, আধুনিক কম্পিউটার, উচ্চক্ষমতার রঙিন প্রিন্টার ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাল নোট তৈরির প্রবণতা বেড়েছে। ২০২৩ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেও জাল নোটের লেনদেনের চেষ্টা হচ্ছে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাল নোটসংক্রান্ত গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। একই সঙ্গে আসল নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য যাচাই করে লেনদেনের পরামর্শ দেয়।
চলতি বছর কোরবানির ঈদ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ স্থাপনের নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সময়ে টঙ্গী ও গুলিস্তানে পৃথক অভিযানে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) প্রায় ৩৪ লাখ টাকার জাল নোট উদ্ধার করে।

