জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)—যে প্রতিষ্ঠান দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, মুদ্রণ ও শিক্ষাক্রম উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে—সেই প্রতিষ্ঠানেই বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনসিটিবিতে মোট ২ হাজার ৭১১ কোটি ২০ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিশেষভাবে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও সরবরাহ কার্যক্রমে নানা ধরনের অসঙ্গতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অতিরিক্ত ভাতা ও সম্মানি নিয়েছেন। একই সঙ্গে বই ছাপার দরপত্র প্রক্রিয়ায়ও বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ ভাতা দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ১ কোটি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ২৯৭ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিধিবহির্ভূতভাবে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার সম্মানি গ্রহণ করেছেন, যার পরিমাণ ৭৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩ টাকা। নিয়মিত দায়িত্ব পালনের জন্যও অতিরিক্ত সম্মানি দেওয়ায় আরও ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ৮৫০ টাকা ক্ষতির কথা বলা হয়েছে।
প্রেস মনিটরিংয়ের জন্য পৃথকভাবে এজেন্ট নিয়োগ থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ খাতে বোর্ডের ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এছাড়া দরপত্রসংক্রান্ত কমিটির সদস্যদের প্রাপ্যতার বাইরে সম্মানি দেওয়ায় আরও ৩৫ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকা ক্ষতির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম। তার দাবি, ২০১০ সালের পর পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়েই কর্মকর্তাদের সম্মানি দেওয়া হয়েছে এবং এতে কোনো অনিয়ম হয়নি। নিরীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, রয়্যালটি বিল থেকে নির্ধারিত হারে ভ্যাট ও আয়কর কেটে না রাখায় সরকারের ২২ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৮২১ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
দরপত্রে অনিয়ম, কোটি কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়:
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ না করে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে বই মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়ায় ৮৯ কোটি ৫৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬৯৭ টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। এছাড়া মাত্র একজন দরদাতা অংশ নেওয়া সত্ত্বেও দরপত্র বাতিল না করে উচ্চমূল্যে কার্যাদেশ দেওয়ায় সরকারের ৬১ কোটি ৮ লাখ ৮২ হাজার ৪১৫ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরীক্ষায় বলা হয়, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের ২২২টি লটে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে কার্যত একজন করে দরদাতা অংশ নেন এবং তারা প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দর প্রস্তাব করেন। এরপরও তাদের যোগ্য ঘোষণা করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারদের মধ্যে যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া গেলেও দরপত্র বাতিল করা হয়নি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের ৫৯৪টি লট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৪৬টি লটে প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতাকে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। পরে দ্বিতীয় থেকে একাদশ সর্বনিম্ন দরদাতাদের মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বেশি মূল্যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
এতে সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) ২০০৮-এর বিধি ১২৭-এর উপবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে সরকারের ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৩ হাজার ৩৪৩ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষায় দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে লিখন আর্ট প্রেসের মালিক নেছারউদ্দিন হাওলাদার বলেন, সর্বনিম্ন দরদাতা কেন কার্যাদেশ পাননি, সে বিষয়ে তার কোনো তথ্য জানা নেই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক, এসএসসি ভোকেশনাল, ইবতেদায়ি, দাখিল ও দাখিল ভোকেশনাল স্তরের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহে মোট ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৭৮৫ কোটি ৮ লাখ টাকা।
কিন্তু এই ব্যয়ের বিপরীতে কাগজ ও পাঠ্যপুস্তকের মান যাচাইয়ের জন্য কোনো স্বীকৃত পরীক্ষাগারের টেস্ট রিপোর্ট সংগ্রহ করা হয়নি। বিএসটিআই, বিসিএসআইআর বা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো স্বীকৃত পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনও পাওয়া যায়নি বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে পুরো ব্যয়কেই অনিয়মিত ব্যয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি চাহিদার অতিরিক্ত বই মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়ায় সরকারের আরও ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ক্ষতির কথা বলা হয়েছে।
এসব অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি এনসিটিবির সদস্য আজীজ হায়দার ভূইয়া। অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়মের ঘটনা নতুন নয়। তার মতে, এনসিটিবির বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রমে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে বলেই এমন অভিযোগ সামনে এসেছে।

