অনলাইনভিত্তিক ট্রাভেল সেবা প্রতিষ্ঠান ফ্লাইট এক্সপার্টের বিরুদ্ধে প্রায় ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি শত শত গ্রাহক ও সাব-এজেন্টের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার পর প্রতিশ্রুত বিমান টিকিট সরবরাহ করেনি। পরে সেই অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর ও রূপান্তর করে এর প্রকৃত উৎস ও মালিকানা গোপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ১১ জুলাই রাজধানীর মতিঝিল থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধিত ২০১৫)-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় সাতজনের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়।
মামলায় অভিযুক্তরা হলেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সালমান বিন রশিদ শাহ সায়েম, প্রেসিডেন্ট এম এ রশিদ শাহ সম্রাট, পরিচালক আমির হামজা রশিদ শাহ নায়েম, এ কে এম শাহদাত হোসেন ও আব্দুল গণি মেহেদী, অর্থ বিভাগের প্রধান মো. সাকীব হোসেন এবং সোমা ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিসেসের স্বত্বাধিকারী মোতাহের হোসেন।
সিআইডি জানায়, ২০১৬ সালে অনলাইনে বিমান টিকিট বিক্রির মাধ্যমে ফ্লাইট এক্সপার্ট যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি হোটেল বুকিং, হজ ও ওমরাহ প্যাকেজসহ বিভিন্ন ভ্রমণসেবা চালু করে। ২০১৯ সালে এফইবিডি নামে একটি যৌথ মূলধনী কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হলেও প্রতিষ্ঠানটি ফ্লাইট এক্সপার্ট ও এফইবিডি—দুই নামেই ব্যবসা পরিচালনা এবং ব্যাংকিং লেনদেন করে আসছিল।
তদন্তে উঠে এসেছে, আকর্ষণীয় মূল্যছাড়ের ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দেশজুড়ে বিভিন্ন সাব-এজেন্ট ও সাধারণ গ্রাহকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অগ্রিম অর্থ সংগ্রহ করে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়েও টিকিট সরবরাহ করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের ১ আগস্ট ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান বিন রশিদ শাহ সায়েম দেশত্যাগ করেন এবং এরপর থেকেই গ্রাহকদের অভিযোগ আরও বাড়তে থাকে।
সিআইডির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এফইবিডির নামে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়া অর্থ পরে ফ্লাইট এক্সপার্টের অন্য হিসাবগুলোতে স্থানান্তর করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে অর্থ পাঠানো, নগদ উত্তোলন এবং বিভিন্ন উপায়ে অর্থ রূপান্তরের মাধ্যমে সেই অর্থের প্রকৃত উৎস, মালিকানা ও ব্যবহার আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে তদন্তে প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে।
তদন্তে আরও জানা যায়, ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেশ ছাড়ার পরও প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন পরিচালক এবং অর্থ বিভাগের প্রধান বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ উত্তোলন ও স্থানান্তর করেছেন। সিআইডির দাবি, এসব লেনদেন প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
এছাড়া তদন্তে এমন অভিযোগও উঠে এসেছে যে, আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার অনুমোদিত বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি থেকে টিকিট সংগ্রহের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক গ্রাহকের কাছ থেকে পুরো অর্থ নেওয়ার পরও টিকিট দেওয়া হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই টিকিটের বিপরীতে একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও অর্থ নেওয়ার ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে প্রতারণার মাধ্যমে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৩১ হাজার ৯০ টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া গেছে। পরে বিভিন্ন ব্যাংকিং লেনদেনের মাধ্যমে ওই অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করে মানিলন্ডারিং সংঘটিত হয়েছে বলেও তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। অর্থের গতিপথ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অভিযোগের সঙ্গে জড়িত অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

