হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির মামলার আসামি এবং আলোচিত ব্যবসায়ী মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. গোলাম সরোয়ার চৌধুরীর নামে তিনটি ব্যাংকে থাকা প্রায় ১৬২ কোটি টাকার মেয়াদি আমানতের (এফডিআর/এমটিডিআর) তথ্য অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন শাখার নথি ও হিসাবসংক্রান্ত তথ্য তলব করেছে সংস্থাটি।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) কাছে পৃথক চিঠি পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় নথি আগামী ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে। চিঠিগুলো দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো হয়েছে।
রোববার (১২ জুলাই) দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তদন্তে এমন তথ্য পাওয়া গেছে যে, ঋণের অর্থ যথাযথভাবে পরিশোধ না করে বিভিন্ন ব্যাংকে মেয়াদি আমানতসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ইতোমধ্যে মামলা রয়েছে। এখন সেই অর্থের উৎস, ব্যবহার এবং আর্থিক লেনদেনের প্রকৃতি যাচাই করা হচ্ছে।
দুদকের তদন্ত কর্মকর্তার পাঠানো চিঠিতে তিনটি ব্যাংকে মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজের নামে থাকা সব মেয়াদি আমানতের (এমটিডিআর/এফডিআর) হিসাব, নথি, লেনদেনের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন ব্যাংকের চট্টগ্রামের দেওয়ানবাজার, লালদিঘী ও ঈদগাহ শাখায় প্রতিষ্ঠানটির নামে প্রায় ৭০ কোটি টাকার এমটিডিআর রয়েছে।
এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রাম বিভাগের মোহরা, খাতুনগঞ্জ, পাঁচলাইশ, প্রবর্তক মোড় এবং খুলশী শাখায় প্রায় ১২ কোটি টাকার এফডিআরের তথ্য পেয়েছে দুদক।
অন্যদিকে, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও আগ্রাবাদ শাখায় প্রতিষ্ঠানটির নামে প্রায় ৮০ কোটি টাকার এমটিডিআরের তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে তিনটি ব্যাংকে প্রায় ১৬২ কোটি টাকার মেয়াদি আমানতের তথ্য যাচাই করছে সংস্থাটি।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গোলাম সরোয়ার চৌধুরী, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আহসানুল আলম, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল মাওলাসহ মোট ৫৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সালের নভেম্বরে মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজ চট্টগ্রামের ইসলামী ব্যাংকের চাক্তাই শাখায় ঋণের আবেদন করে। পরের মাসেই শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আবেদনটি অনুমোদন করেন।
দুদকের অভিযোগ, মিথ্যা তথ্য ও জাল কাগজপত্রের ভিত্তিতে ঋণের আবেদন করা হলেও যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিকল্পিতভাবে ঋণ অনুমোদন করেন। প্রথমে ৮৯০ কোটি টাকার ঋণের আবেদন করা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা করা হয়।
তদন্তে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, যে উদ্দেশ্যে ঋণ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে সেই খাতে অর্থ ব্যবহার করা হয়নি। বরং ঋণের অর্থ অন্য একটি শিল্পগোষ্ঠীর ব্যবসায়িক দায় পরিশোধে ব্যবহার করা হয়, যা ব্যাংকের অর্থ ব্যবহারের শর্তের পরিপন্থী।
দুদক কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে চলমান তদন্তে ঋণের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে স্থানান্তর হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা মেয়াদি আমানতগুলোর অর্থের উৎস, লেনদেনের ধরন এবং সম্ভাব্য অনিয়মের বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে। প্রয়োজনীয় নথি পর্যালোচনার পর তদন্তের পরবর্তী ধাপে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

