২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশে পুলিশ ও কারা হেফাজতে মোট ২৫৭ জনের মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরেছে মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংগঠনটির দাবি, এ সময়ে পুলিশ হেফাজতে ৩০ জন এবং কারা হেফাজতে ২২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একই সঙ্গে তাদের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৪৩ জন নেতা-কর্মীরও হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ এসব ঘটনায় নির্যাতন বা অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আওয়ামী লীগের তিনজন নেতা-কর্মীর মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ জনে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আরও ১৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, পুলিশ ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতা-কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তাঁর অভিযোগ, আটক বা জিজ্ঞাসাবাদের সময় বলপ্রয়োগ এবং কারাগারে চিকিৎসাসেবার ঘাটতির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা উচিত।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটিও (এইচআরএসএস)। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ইজাজুল ইসলাম বলেন, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তারা পরিসংখ্যান তৈরি করেন। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তাঁর মতে, গ্রেপ্তার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক বন্দি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ছেন। এছাড়া রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগও নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত পুলিশ ও কারা হেফাজতে ২১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ হেফাজতে ২২ জন এবং কারা হেফাজতে ১৯০ জন মারা গেছেন। তবে সংস্থাটি মৃত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় আলাদাভাবে সংরক্ষণ করে না।
এমএসএফের প্রতিবেদনে কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনারও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ফরিদপুরে ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যু, বগুড়ার আওয়ামী লীগ নেতা শাহনূর আলম শান্তের মৃত্যু, ঢাকার মতিঝিল এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা হাজী সুলতান মিয়ার মৃত্যু এবং নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবিরের মৃত্যুর ঘটনাকে সামনে আনা হয়েছে। এসব ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা নির্যাতন, চিকিৎসায় অবহেলা কিংবা যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারের পরিবারও তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পরিবারের দাবি, একাধিক মামলায় আটক থাকার পাশাপাশি দীর্ঘ রিমান্ড, শারীরিক অসুস্থতা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় তাঁর জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মেছবাহুল আলম সেলিম বলেন, কারাগারের ভেতরে কোনো বন্দির মৃত্যু হয় না; অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর কেউ মারা গেলে সেটি হাসপাতালেই ঘটে। তাঁর দাবি, কারাগারে নির্যাতন বা চিকিৎসায় অবহেলার কোনো ঘটনা নেই এবং প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনাই তদন্ত করা হয়।
একইভাবে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করা হয়। তদন্তে নির্যাতনের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে অনেক অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনায় নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং কোনো বন্দির রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আচরণ করা হয় না।

